একাত্তরের ঈদ

মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর, বাংলার মুসলমানরাও এর ব্যাতীক্রম নয়।

চলুন ফিরে যায় ৪২ বছর আগে একাত্তরে...
কেমন ছিল একাত্তরের ঈদ?

একাত্তরে ঈদুর ফিতর ছিল ২০ নভেম্বর।
আম্মা শহীদ জননী জাহানারা ইমাম 'একাত্তরের দিনগুলি' বইতে লিখেছেন-
"২০ নভেম্বর, ১৯৭১
আজ ঈদ।
ঈদের কোনো আয়োজন নেই আমাদের বাসায়।
কারো জামাকাপড় কেনা হয়নি। দরজা জানালার পর্দা কাচা হয়নি। বসার ঘরের টেবিলে রাখা হয়নি আতরদানী। শরীফ, জামি ঈদের নামাজও পড়তে যায়নি।
কিন্তু আমি খুব ভোরে উঠে ঈদের সেমাই, জর্দা রেঁধেছি। যদি রুমীর সহযোদ্ধা কেউ আজ আসে এ বাড়িতে? বাবা-মা-ভাই-বোন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন কোন গেরিলা যদি রাতের অন্ধকারে আসে এ বাড়ীতে? তাদেরকে খাওয়ানোর জন্য আমি রেঁধেছি পোলাও, কোর্মা, কোপ্তা, কাবাব। তারা কেউ এলে আমি চুপিচুপি নিজের হাতে বেড়ে খাওয়াবো। তাদের জামায় লাগিয়ে দেবার জন্য এক শিশি আতরও আমি কিনে লুকিয়ে রেখেছি।"
পুরনো পত্রিকা ঘাঁটতে যেয়ে একাত্তরে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের ও তৎকালীন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের মুখপাত্র 'সাপ্তাহিক জয়বাংলা'তে একাত্তরের ঈদ নিয়ে কিছু তথ্য পাই।
আসুন একাত্তরের 'সাপ্তাহিক জয়বাংলা'র চোখে একাত্তরের ঈদকে দেখে আসি...

০১।

একাত্তরের ঈদের আগের দিন (১৯/১১/১৯৭১)-এ সাপ্তাহিক জয়বাংলার ২৮ তম সংখ্যায় সম্পাদকীয় কলামে 'উৎসবের ঈদ নয়, ত্যাগের ঈদ' শিরোনামে' ঈদ উপলক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর বাণী প্রচার করা হয়।
বঙ্গবন্ধুর বাণীর একটি অংশ ছিল:
আমি নিজেকে বাঙালী ভাবতে গর্ববোধ করি।
বহতা নদীর মতো আমাদের সংস্কৃতির ধারাও বেগবতী ও প্রাণাবেগপূর্ণ।
আত্মশক্তিতে উদ্বুদ্ধ হলে বাঙালী আবার বিশ্বসভায় মাথা তুলে দাঁড়াবে।
বাঙালী হওয়ার সঙ্গে ধর্মে মুসলমান থাকার কোন বিরোধ নেই।
একটি আমার ধর্ম। অন্যটি জাতি পরিচয়।
ধর্ম আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও আচার। জাতি পরিচয় আমার সমষ্ঠিগত ঐতিহ্য।
একজন হিন্দু বাঙালী ও মুসলমান বাঙালী অথবা, বৌদ্ধ বা, খ্রীষ্টান বাঙালীর মধ্যে পার্থক্য এটুকুই যে, তাদের ধর্মমত শুধু আলাদা কিন্তু খাদ্য, রুচি, ভৌগলিক পরিবেশ, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, বর্ণ ও রাজনৈতিক লক্ষ্যের দিক থেকে তারা অভিন্ন...

০২.

১৯ নভেম্বর, ১৯৭১।
একাত্তরের ঈদের আগের দিন।
এদিন কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় প্রবাসী স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্র 'সাপ্তাহিক জয়বাংলা'র ২৮ তম সংখ্যা।
প্রথম পাতায় প্রকাশিত হয় 'এই ঈদে আমাদের প্রার্থনা হোক.....' শিরোনামে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের বাণী।

০৩.
ঈদের দিন ২০ নভেম্বর, ১৯৭১-এ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হতে ঈদ উপলক্ষ্যে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের একটি বাণী প্রচারিত হয়।
পরবর্তীতে এই বাণীটি ২৬ নভেম্বর, ১৯৭১-এ 'সাপ্তাহিক জয়বাংলা'র ২৯ তম সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।

০৪.

২০ নভেম্বর, ১৯৭১ সাল।
কলকাতায় মুক্তিবাহিনীর সদর দপ্তরে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
প্রথম সারিতে পাশাপাশি আছেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ ও জেনারেল ওসমানী...
(ছবিতে পাঠকের ডানদিক হতে ৬ষ্ঠ ও ৭ম জন)

০৫.
ঈদের নামাজের পর শহীদদের আত্মার মাগফিরাত, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, বাঙালীর দুর্দিনের অবসান, বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘায়ু ও মুক্তি কামনা মোনাজাত করা হয়...

০৬.

ঈদের নামাজ শেষে কোলাকুলি করছেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ ও বঙ্গবন্ধু-পুত্র লেফট্যান্ট শেখ কামাল...

ছবি: সাপ্তাহিক জয়বাংলা।

যেসব মাধ্যমে লিখাটি প্রকাশিত হয়েছে: ফেসবুক, ইস্টিশন ব্লগ।

Comments

Popular posts from this blog

মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতনে পাকিস্তানি মানস

কল্পিত বিহারি গণহত্যাঃ একাত্তরের পরাজিত শক্তির অপকৌশল

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে চীনের ভূমিকা ও ভাসানীর দায়