মা আফিসা খাতুন

একাত্তরের নভেম্বর মাস।
যুদ্ধ প্রায় শেষ হবার পথে।

পাকিরাও বুঝে গিয়েছিল যুদ্ধ শেষ হতে চলেছে, বাংলায় তাদের হুকুমের দিন ফুরোচ্ছে।
এখন পাকিদের লক্ষ্য একটাই, জাতিগতভাবে বাঙালীদের ধোলাই করা আর এর মোক্ষম অস্ত্র বাঙালী নারীর পেটে খান সেনাদের বীজ রেখে যাওয়া।



নোয়াখালীর শর্শদী বাজার এলাকায় অক্টোবর মাসে পলায়নরত পাক বাহিনী ক্যাম্প স্থাপন করে।
চারদিকে অশান্তি, আতঙ্ক, ভয়।
পাকিরা যাকে পাচ্ছে গুলি করে মারছে, বাঙালী নারীদের ধর্ষণ করছে আর রাজাকাররা লুটতরাজ চালাচ্ছে।


আফিসা খাতুন।
দারিদ্রতার কষাঘাতে পিষ্ঠ পিতৃহীন আফিসা খাতুন বৃদ্ধা মা ও ছোট ভাইকে নিয়ে শর্শদী বাজারের দক্ষিণ খানবাড়ী গ্রামে থাকতেন।
রাজাকার ওসমান আলীর আফিসাদের ভিটামাটির উপর লোভ ছিল। আফিসাকে পাক-বাহিনীর হাতে তুলে দিতে পারলে এই স্বপ্ন পূরণ হয়।


নভেম্বরের প্রথম দিকে ওসমান আলী নারীমাংসের লোভ দেখিয়ে পাকবাহিনীদেরকে আফিসার বাড়িতে নিয়ে আসে।
পাকবাহিনীদের দেখে খড়ের গোলার নিচে লুকিয়ে যায় আফিসা কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না।
চুলের মুঠি ধরে টেনে বের করে আনা হয়।
গণিমতের মাল আফিসাকে পাকিদের পছন্দ হয়। ওরা ওসমান আলীকে ১০ টাকা বকশিস দেয়।


আফিসা, আফিসার বৃদ্ধা মা পাকিদের হাতে-পায়ে ধরে, আল্লাহ-নবী-ধর্মের দোহাই দেয় কিন্তু পাকিদের দয়া হয় না।
কেমন করেই বা দয়া হবে? মালাউন-মুরতাদ বাঙালী নারীর পেটে সাচ্চা-মুমিনের জন্ম দিতে হবে তো...
আফিসার জীবনে জাহান্নাম নেমে আসে।


আফিসাদের ঘরের বাইরে রাজাকার ওসমান আলীর বিশেষ পাহারা; যাতে, সাচ্চা মুমিনের বীজ বপনে কোন সমস্যা না হয়।
তিন দিন পর, গভীর রাতে সুযোগ পেয়ে, আফিসা খাতুন বৃদ্ধা মা ও ছোট ভাইকে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যান।


পাকি কিংবা, রাজাকার কেউ তেমন উচ্চবাচ্য করেনি। করবেই বা কেন?
আফিসাদের ভিটে মাটির দখল পেল রাজাকার ওসমান আলী আর পাকিরা আফিসা পেটে সাচ্চা মুমিনের বীজ বপন করেছে...
বাঙালীর কষ্টে সবাই সুখী...

[সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র৮ম খন্ড (বাংলাদেশ তথ্য মন্ত্রনালয়)।]

Comments

Popular posts from this blog

মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতনে পাকিস্তানি মানস

অপারেশন সার্চলাইটঃ একটি পরিকল্পিত গণহত্যার সূচনা

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে চীনের ভূমিকা ও ভাসানীর দায়