গণজাগরণের ডায়রী: আগুন ঝরা দিনগুলো



সবকিছু ঠিক থাকলে আর কিছু দিনের মধ্যে কাদের মোল্লাকে ফাঁসিতে ঝুলানো হবে।
ভাবতেই এক পরম তৃপ্তি অনুভব করছি।
খবরটা শুনার পর থেকে আবেগাপ্লুত হয়ে আছি।


৪২ বছর, অনেক লম্বা সময়।
সবকিছু সময়ের চাপে হালকা হয়ে আসে।
তারপরও আমরা আশাবাদী।
এই বাঙলার শেষ বিশ্বাসঘাতককেও আমরা ফাঁসির দড়িতে ঝুলাবো।

৫২, ৬৬, ৬৯, ৭০, ৭১, ৯০'র মত আরেকটি গণজাগরণ হলো ফেব্রুয়ারী, ২০১৩।
আমার সৌভাগ্য আমি এই আন্দোলনের সাথে, গণজাগরণের সাথে সরাসরি যুক্ত...


আজ থেকে অনেক বছর পর, যদি বেঁচে থাকি, তখন আমার উত্তর-প্রজন্মকে বলতে পারবো-
আমি সেই আগুন ঝরা দিনগুলোতে ছিলাম...
আমি সেখানে ছিলাম, যখন বাঙালী তার স্বজাতির হন্তারক আর মায়ের ধর্ষকদের ফাঁসির দাবিতে ঘর ছেড়ে বেরিয়েছিল...
আমি বাঙালীর বিশুদ্ধ অনুভূতির প্রকাশের রাজস্বাক্ষী...

সেই দিনগুলোতে ডায়রি লিখতাম।
আমার কাঁচা লেখালেখির হাতে চেষ্টা করেছি সেই দিনগুলোকে ধরে রাখতে...

আজ আমার সেই ডায়রিটা সবাইকে পড়তে দিলাম।

জয় বাঙলা..
জয় বঙ্গবন্ধু...
যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই...
বাংলাস্তানীরা নিপাত যাক...


০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩/ মঙ্গলবার:

শিবিরের ডাকা হরতাল চলছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহজালাল হলে আছি।

দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় রেলস্টেশনে আসার পর জানতে পারলাম মিরপুরের কসাই কাদের মোল্লার ফাঁসি হয়নি, হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদন্ড। মনটা খারাপ হল। সবার একই অবস্থা। রাগে-ক্রোধে ফুঁসতে থাকলাম আমরা।

সেদিনই দুপুরেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিল হয়ে গেল। মিছিলের দাবী একটাই: ‘এই রায় মানি না, কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই’।


০৬ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩/ বুধবার:

আজও হরতাল চলছে শিবিরের। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হলেই আছি।

আগের দিনের দেয়া ঘোষণা অনুসারে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ে কাদের মোল্লাসহ সব যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করা হল। মিছিল শেষে সিদ্ধান্ত হল আগামীকাল হতে বিশ্ববিদ্যালয় হতে সর্বদলীয় ও সর্বশ্রেণীর ছাত্র-শিক্ষকের মিলিত বিক্ষোভ করা হবে।

বিকেলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নেতৃত্বে ষোলশহর স্টেশন হতে ষোলশহর গোল-চত্বর পর্যন্ত কাদের মোল্লাসহ সব যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে ব্যানার, পোস্টার নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করা হল।

ষোলশহর গোল-চত্বরে বিক্ষোভ সমাবেশ করা হয়। রাস্তা পারাপারকারী সাধারণ জনতাদের অনেকে আমাদের সমাবেশে যোগ দিল। আমাদের স্লোগানের সাথে গলা মিলালো।

সন্ধ্যায় সমাবেশ শেষ করে ষোলশহর গোল-চত্বর হতে চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমী পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল করলাম। ষোলশহর, জিইসি, ওয়াসা মোড়ের সাধারণ জনতা আমাদের স্লোগানের সাথে গলা মিলালো।

শিল্পকলা একাডেমীতে এসে আমরা কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে সিএনজিতে করে জামাল খানের কাছে এরিসট্রোক্র্যাট রেস্টুরেন্টের সামনে পৌঁছুলাম। এরিসট্রোক্র্যাটের সামনে হতে জামাল খান প্রেস ক্লাব পর্যন্ত মিছিল নিয়ে এগিয়ে গেলাম আমরা। আমাদের সাথে গলা মিলালো সাধারণ জনতা।

প্রেস ক্লাবের সামনে তখন জনসমুদ্র। চারদিক থেকে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দাবীতে স্লোগান, মিছিল আসছিল। ‘জয় বাংলা’, ‘রাজাকারের ফাঁসি চাই’, ‘কসাই কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই’..... স্লোগানে স্লোগানে চারদিক প্রকম্পিত হচ্ছে। বুঝলাম, বাঙালী আবার জাগছে।

প্রেস ক্লাবের সামনে আমরা মোমবাতি দিয়ে একাত্তর লিখলাম। এরপর শুধু স্লোগান আর স্লোগান। সাধারণ মানুষ আমাদের সাথে কন্ঠ মিলাল।

ছোট্ট একটা বাচ্চা মেয়ে তার মায়ের সাথে আমাদের কাছে এসে দাঁড়াল। মুখে আঙুল দিয়ে আধো আধো বোলে বলল, ‘জয় বাংলা’। চোখে আনন্দের পানি চলে এলো। বাঙালী ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।

প্রেসক্লাবের সামনের রাস্তা পুরোটা জুড়ে প্রতিবাদী মানুষের ঢল। চেরাগী পাহাড় মোড় হতে ডা: খাস্তগীর স্কুল পর্যন্ত মানুষের ভীড়। সবার চোখে-মুখে ক্ষোভের স্পষ্ট আভা দেখা যাচ্ছে। সবার কন্ঠে স্লোগান।

যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই, কসাই কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই, জয় বাংলা, জয় বাংলা....................


০৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩/ বৃহস্পতিবার:

সকাল থেকেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিজীবি চত্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা গান গেয়ে, স্লোগান দিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবী জানাচ্ছে।

বারোটার দিকে আমরা কাটা-পাহাড় হতে মিছিল নিয়ে রেলস্টেশনে আসলাম। রেলস্টেশনে এরিমধ্যে জড়ো হয়েছে শত শত শিক্ষার্থী। চারপাশ থেকে আসছে ‘জয় বাংলা, রাজাকারদের ফাঁসি চাই’ ধ্বনি।

এরপর যা হল, তা শুধুই ইতিহাস। সর্বদলীয় ও সর্বশ্রেণীর শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা মিলে আমরা সবাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মিছিল করলাম। হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ‘জয় বাংলা, রাজাকারদের ফাঁসি চাই, জামাত-শিবির বাংলা ছাড়, কসাই কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই’...স্লোগানে কেঁপে উঠল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আকাশ বাতাস। আমাদের সবার দাবি একটাই- ‘যুদ্ধাপরাধী, রাজাকারদের’ ফাঁসি চাই।

দুপুর তিনটার দিকে ষোলশহর স্টেশন হতে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল করলাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বদলের, সর্বশ্রেণীর শিক্ষক-শিক্ষার্থী এই মিছিলে অংশ নেয়। মিছিলটি ষোলশহর রেলস্টেশন হতে ষোলশহর, জিইসি, ওয়াসা, আলমাস, কাজীর দেউড়ি, আসকার দিঘির পাড় হয়ে ডা: খাস্তগীর স্কুলের সামনে দিয়ে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে আসলো। পথে সাধারণ জনতা মিছিলের স্লোগানের সাথে গলা মিলিয়ে, হাত নেড়ে আমাদের সাথে একাত্মতা জানাল।


জামালখান প্রেসক্লাব চত্বর তখন জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষ একত্রিত হয়েছে এখানে। আজ কোন ভেদাভেদ নেই, সবাই আজ একতাবদ্ধ। আজ আমরা সবাই শুধুই বাঙালী।

সবার মুখে স্লোগান। ‘জয় বাংলা, রাজাকারদের ফাঁসি চাই, জামাত-শিবির বাংলা ছাড়, কসাই কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই’...। একতাবদ্ধ বাঙালী সম্মিলিত কন্ঠের দাপটে কেপে উঠছে চট্টগ্রামের আকাশ-বাতাস-মাটি।

জয় বাংলা...যুদ্ধাপরাধী-রাজাকারদের ফাঁসি চাই, জামাত-শিবিরমুক্ত বাংলাদেশ চাই.....জয় বাংলা.....


০৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩/ শুক্রবার:

গত তিনদিন স্লোগান দেয়ার কারণে গলা ভেঙে গেছে। পায়ের পাতায় ফোস্কা পড়ে গেছে। তাই, আজ দুপুর পর্যন্ত হলে বিশ্রাম নিলাম।

বিকাল চারটার ট্রেনে শহরে ফিরে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে আসি। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব তখন জনসমুদ্র। যুদ্ধাপরাধী-রাজাকারদের ফাঁসির দাবিতে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত চারপাশ। আজ আমরা সবাই একাত্তরের রক্তঋণ পরিশোধের ও নতুন এক সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার শপথ নিলাম।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু, ছোট ভাইরা আগে থেকে প্রেসক্লাবের সামনে ছিল। খুঁজে বের করে ওদের সাথে বসে পড়লাম। এরপর শুধু স্লোগান আর স্লোগান.....

জয় বাংলা, বাংলাদেশ ‘জামাত-শিবির-রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধী’ মুক্ত হোক, বাঙালীর এই নতুন জাগরণ দীর্ঘজীবি হোক...জয় বাংলা।


০৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩/ শনিবার:

আজ চট্টগ্রাম শহরে জামাত-শিবির হরতাল ডেকেছে। সকাল থেকে আমরা চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন বিক্ষোভ সমাবেশগুলো ঘুরে ঘুরে দেখছি আর ভাবছি আমরা একাত্তরের বাঙালীদের মতই উদ্বেলিত হতে পেরেছি কি? মনের ভিতর তীব্র এক অনুভূতি। জীবনে প্রথমবারের মত নিজেদের রুমী, বদি, আসাদ, পুলু, টুলু, স্বপনদের উত্তরসূরী মনে হচ্ছে।

জয় বাংলা.....

দুপুরের পরে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আসলাম। মানুষের ভীড়ে হারিয়ে গেলাম। আন্দোলনে মানুষের স্বত:স্ফূর্ত অংশগ্রহন দেখে নিজের অশ্রু দমাতে পারলাম না। আমরা বাঙালীরা এখনো মনুষ্যত্বহীন হয়ে যায়নি।

স্লোগানে স্লোগানে চট্টগ্রামের মাটি কেঁপে উঠছে আর প্রতিবাদী কন্ঠস্বর জানান দিয়ে যাচ্ছে, ‘বাঙালী আবার জেগেছে’।


গলা ফেটে গেছে। গলা দিয়ে খস খস শব্দ বের হচ্ছে। হঠাৎ পেছন থেকে কে একজন কাঁধে হাত দিল। ফিরে দেখি এক বৃদ্ধা। হাতে রং চায়ের কাপ আর পাউরুটি। আমার দিকে সেগুলো এগিয়ে দিয়ে হাসি মুখে বললেন, ‘খাও বাবা। গলায় জোর পাবা।’ আবেগ ধরে রাখতে পারলাম না। চোখ জলে ছল ছল করে উঠল। মনে মনে বললাম, আলিমুল গায়েব বলে যদি কিছু থাকে, তিনি যেন বাঙালীর এই জাগরণের বাতি নিভিয়ে না দেন।

সন্ধ্যা হয়ে আসছে। সকল যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি ও জামাত-শিবিরসহ সকল ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের দাবিতে উত্তাল চট্টগ্রাম জামাল খান এলাকা।

রাতের ট্রেনে ক্যাম্পাসে ফিরে আসি। বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্টে ছাত্ররা মশাল মিছিল করছে। যোগ দিলাম মিছিলে। স্লোগানে স্লোগানে তখন কাঁপছে ‘পাকিস্তানীদের দালাল চবির শিবিরদের কলিজা’।

জামাত-শিবির-রাজাকার এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়.....


১০ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩/ রবিবার:

সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের চেতনা চত্বরে (বুদ্ধিজীবি চত্বর) ছাত্র-শিক্ষকদের সমাবেশ হল। স্লোগান আর দেশাত্মকবোধক গান গাওয়া হল।

স্লোগান.................

বিকেলে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেতনা চত্বরে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক চলচ্চিত্র ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ ও ‘গেরিলা’ দেখালাম।

রাত আটটার কিছু পরে, আমরা দু’তিনশো ছাত্র-ছাত্রী মশাল মিছিল নিয়ে সারা ক্যাম্পাস প্রদক্ষিন করলাম।

‘জয় বাংলা’

‘এক দফা, এক দাবি
যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই’

‘জামাত-শিবির-রাজাকার
এই মুহুর্তে বাংলা ছাড়’

‘ধর...ধর...শিবির ধর...
ধইরা ধইরা, ধোলাই কর...
বাংলাদেশ কলঙ্কমুক্ত কর’...স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা।


১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩/ শনিবার:

রাত একটার দিকে ফেসবুক মারফত জানতে পারলাম, ধর্মান্ধ-জামাত-শিবিররা ব্লগার স্থপতি রাজীব হায়দারকে (থাবা বাবা) জবাই করে হত্যা করেছে। থাবা ভাই আমার ফেসবুক বন্ধু ছিলেন। খবরটি জানার পর মানসিক ভেঙে ভীষন ভেঙে পড়লাম। ক্ষোভ-আতংক বিরাজ করছে সবার মাঝে।

ফেসবুকের বিভিন্ন জামাত-শিবির সমর্থক পেজ থেকে ‘একজন নাস্তিক মরেছে, খুব ভাল হয়েছে’ জাতীয় পোস্ট আসছে। অবাক হচ্ছি... একজন মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা নিয়ে এইসব পেজের এডমিন পাকি-কুত্তারবাচ্চাগুলোর কোন দু:খবোধ নেই।

-----------------------------------

[এরপর নানা কারনে আর ডায়রী লেখা হয়নি]

এখন সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আপনমনে বলে উঠি-

আহা! কি যে সব দিন ছিল...


জয় বাঙলা..
জয় বঙ্গবন্ধু...
যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই...
বাংলাস্তানীরা নিপাত যাক...

Comments

Popular posts from this blog

মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতনে পাকিস্তানি মানস

অপারেশন সার্চলাইটঃ একটি পরিকল্পিত গণহত্যার সূচনা

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে চীনের ভূমিকা ও ভাসানীর দায়