বাবার গল্প


বাবার কথা মনে হলে প্রথম যে বিষয় মাথায় আসে, তা হলো, বায়াত্তরের জানুয়ারির শেষে বাবা বীরাঙ্গনা মায়েদের সাথে দেখা করেন। সেখানে বাবার একটি ভিডিও ফুটেজ আছে, সম্ভবতঃ এবিসি নিউজের। বাবা একজন বীরাঙ্গনা মায়ের সাথে কথা বলছিলেন, কন্যার দিকে তাকাতে পারছিলেন না, দৃষ্টি তাঁর শূণ্য, চেহারায় পিতৃত্বের অসহায়ত্বের ছাপ, চোখ জলে চিকচিক করছে; এরকমই ছিলেন আমাদের বাবা, বাঙলা-বাঙালির জন্য এরকম মমতা, আবেগ আর কারো ছিল না। বাঙলা ও বাঙালিকে এভাবে কেউ কখনও ভালোবাসেনি, ভালোবাসবেও না।

প্রতিবছর আগস্ট মাস আসে, ১৫ আগস্ট আসে।
বাঙালি জাতি অশ্রুসজল হয়ে জাতির পিতাকে স্মরণ করে। হ্যাঁ, জাতির পিতাকে; যাকে আমরা স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছরের মাথায় হত্যা করেছিলাম।

বর্ণাঢ্য ও ঘটনাবহুল জীবনের অধিকারী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবর রহমানের সৃত্মিচারণ করলে হাজার হাজার পাতা লেখা যাবে। বাঙলা ও বাঙালির জন্য এতটা প্রেম, ভালোবাসা, মমতা, দরদ; আর কোন মানুষের মাঝে দেখা যায়নি। নিজের সারাজীবন উৎসর্গ করেছিলেন এই বাঙলা ও বাঙালির জন্য, তাঁর মরণও এই বাঙলার জন্য, বাঙালির জন্য। বাঙলা-বাঙালিকে বড্ড বেশি ভালোবাসতেন পিতা, তাই প্রো-পাকিস্তানী বিশ্বাসঘাতকদের হাতে নির্মমভাবে স্বপরিবারে প্রাণ দিতে হলো তাঁকে।

পাকিস্তান ১৯৭২ সালের ০৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয়। সেদিনই বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তান থেকে যুক্তরাজ্যে নিয়ে যাওয়া হয়।
পাকিস্তান থেকে বিমানে উঠার আগে ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে বলে- শেখ সাহেব, মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান-বাংলাদেশের মাঝে কোন সম্পর্ক রাখা যায় কি-না, তা একটু দেখবেন
বঙ্গবন্ধু উত্তর দিলেন- সে ভার আমি আমার দেশের মানুষের উপর ছেড়ে দিলাম

যুক্তরাজ্য থেকে ভারতে আসেন বঙ্গবন্ধু। দেশে ফেরার জন্য তাঁর মন তখন উন্মাতাল। ১৯৭২ এর ১০ জানুয়ারি দিল্লির সমাবেশে ইন্দিরা গান্ধী ও ভারতের জনসাধারণের প্রতি যুদ্ধকালীন সমর্থন ও সহযোগীতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে পিতা। দিল্লি সমাবেশ শেষ করে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে ফেরেন।

বঙ্গবন্ধু বিমানে করে বাংলাদেশে এলেন। বিমানবন্দরে আনন্দ অশ্রু নিয়ে তাঁকে বরণ করলেন মুজিব সরকার প্রতিনিধিরা। সেদিন বিমানবন্দরে খুশির জোয়ার বইছিল। সবার চোখে আনন্দ জল। বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলেন সবাই।

রেসকোর্স ময়দানে তখন পিতার জন্য অপেক্ষা করছিল লাখো বাঙালি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যাওয়া হলো। পিতাকে মঞ্চে দেখতে পেয়ে আনন্দের অশ্রুতে সিক্ত হলো বাঙালি বঙ্গবন্ধু বাঙালির এই আবেগ দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি অশ্রুসজল ছিলেন পিতা বারবার পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে দীর্ঘ নয় মাস বাঙালির নিপীড়নের কথা বলে ডুকরে কেঁদে উঠছিলেন। সত্যিই তিনি ছিলেন বাঙালি জাতি ও রাষ্ট্রের পিতা বাঙালির জন্য আর কেউ কোনদিন এভাবে কাঁদেনি, মমতা অনুভব করেনি
আমি হলফ করে বলতে পারি, বঙ্গবন্ধু সেই ভাষণ শুনে কোন বাঙালির কপোল জলহীন থাকবে না

বঙ্গবন্ধু দৃঢ় কন্ঠে সেদিন বললেন-
যারা আমার বাঙালিকে হত্যা করেছেআমার মা-বোন-মেয়েদের ধর্ষণ করেছেযারা পাকি নরপশুদের সাহায্য করেছেতাদের বিচার হবেই হবে।

বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে কেমন দেখতে চান, সেই প্রসঙ্গে বলেছিলেন-
বাংলাদেশ হবে ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র, যেখানে সবার সমান অধিকার থাকবে

রেসকোর্স থেকে ক্লান্ত বঙ্গবন্ধু চলে যান তাঁর বাসভবন ধানমন্ডি ৩২ নং-এর বাড়িতে এই এলাকায় পাকিস্তানী সৈন্যদের একটি ক্যাম্প ছিল, গৃহবন্দী ছিল শেখ পরিবার, যাতে স্বাধীনতাপন্থি কারো সাথে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের যোগাযোগ থাকতে না পারে।
দেশ স্বাধীন হবার পর মিত্রবাহিনী যৌথভাবে এই এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয় মিত্রবাহিনী ধানমন্ডি টেক ওভার করার পর শেখ ফজিলাতুননেসা মুজিব পাকিস্তানি পতাকা পায়ে মাড়িয়ে ঘর হতে বেরিয়ে আসেন তাঁর সাথে কন্যা শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও ছেলে শেখ রাসেল, শেখ রাসেলের কোলে ভাগ্নে সজীব ওয়াজেদ জয়

এই বাড়িতে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যরা অধীর চিত্তে অপেক্ষা করছিলেন তাঁর বাড়ি ফেরার
বঙ্গবন্ধু বাসায় এলেন। শেখ সন্তানরা ছুটে গিয়ে সজল নয়নে বাবাকে জড়িয়ে ধরেন। বঙ্গবন্ধু পুত্র-কন্যাদের জড়িয়ে ধরে নিজের ঘরের দিকে এগোলেন। মা-বাবাকে পা ধরে সালাম করলেনজড়িয়ে ধরলেন। সবার চোখে জলআনন্দের জলমুক্তির জল। শেখ ফজিলাতুননেসা মুজিব সামনে এসে দাঁড়ালেন। স্বামীর বুকে মাথা রেখে চিৎকার করে কেঁদে মূর্ছা গেলেন। কিছুক্ষন পর স্বাভাবিক হয়ে বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে রইলেন যেন পৃথিবীর কোন শক্তিকে তাঁদের আর আলাদা হতে দেবেন না।

বঙ্গবন্ধুকে সবাই ঘিরে রইলেন। সবার মাঝে খুশির বন্যাচোখে আনন্দের নোনা জল। সবাই নিশ্চিন্তকারনবাঙলা-বাঙালির অভিভাবক ঘরে ফিরেছেআমাদের মাঝে ফিরেছে। স্বাধীন দেশে সেদিন সবাই নিশ্চিন্তে ঘুমোতে গিয়েছিল...

এরপরের ইতিহাস শুধুমাত্র বিশ্বাসঘাতকতার।
বিশ্বাসঘাতকরা দেশ স্বাধীন হবার ঠিক সাড়ে তিন বছরের মাথায় আমরা পিতাকে হত্যা করেছিল, যে মানুষটি আমাদের একটি স্বাধীন দেশ এনে দিয়েছিলেন, আমরা তাঁকে হত্যা করেছিলাম।

আমরা এতটাই অকৃতজ্ঞ, যে মানুষটির কারনে নিজেদের রাষ্ট্র, আত্মপরিচয় পেলাম, যে মানুষটি পাকিস্তানী ও তাদের দোসরদের হাতে নিপীড়িত বাঙলা-বাঙালির জন্য ডুকরে ডুকরে কেঁদেছেন, যে মানুষটি আমাদের সন্তান জ্ঞান করতেন; সেই মানুষকে, বাবাকে আমরা বাঙালিরা বিশ্বাসঘাতক হয়ে স্বপরিবারে হত্যা করলাম।

যদি বাবার হত্যাকান্ডটি স্বপ্ন হতো, যদি ঘুম ভেঙে জানতাম বাবা আছেন, তবে আমাদের চেয়ে সৌভাগ্যবান জাতি আর কেউ হতো না।

আচ্ছা, ১৯৭২ এর ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে রেসকোর্স ময়দানে যে মানুষটা বাঙলা-বাঙালিকে সন্তানের মত আপন করে, সন্তানের দু:খে ডুকরে ডুকরে কেঁদেছিলেন, সেই বাবাকে কি করে আমরা হত্যা করতে পারলাম?

আমরা এত অপবিত্র কেন?

আকন্ঠ কৃতজ্ঞতা, মস্তকাবনত: শ্রদ্ধা, বুকভরা ভালোবাসায় বাবাকে স্মরণ করছি, যাকে আমরা সন্তানরা বিশ্বাসঘাতকতা করে হত্যা করেছি।

আমরা এই মহাপাপের শাস্তি আজ ৩৯ বছর বয়ে চলেছি...

আমরা ক্রমাগত অন্ধকারের অতলে হারিয়ে যাচ্ছি; কারন, আমরা অকৃতজ্ঞ সন্তানরা বাবাকে হত্যা করেছি।


থ্যের জন্য কৃতজ্ঞতা:

০১. বাংলা নামে দেশ - আনন্দবাজার পত্রিকা - আনন্দ পাবলিশার্স।
লিংক: http://www.liberationwarbangladesh.org/2014/07/blog-post_3785.html

০২. বাহাত্তরে দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধুর দেয়া ভাষণ।
লিংক: http://www.liberationwarbangladesh.org/2014/05/blog-post_24.html


[ ফেসবুক পোস্ট -  ০১ , ০২ ]




.

Comments

Popular posts from this blog

মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতনে পাকিস্তানি মানস

কল্পিত বিহারি গণহত্যাঃ একাত্তরের পরাজিত শক্তির অপকৌশল

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে চীনের ভূমিকা ও ভাসানীর দায়