খন্দকার সাহেবের মিথ্যাচার আর কিছু পঁচা লাশের গন্ধ


একাত্তরে চট্টগ্রাম শহরের পাকি-বিহারী-বাঙালি দোসরদের বাঙালি নিপীড়নের উপর "একাত্তরের অশ্রু" নামে একটি প্রজেক্ট করেছিলাম বছর তিনেক আগে।

ওই প্রজেক্টে চট্টগ্রাম শহরের প্রায় ২২ টি ও বিভিন্ন অঞ্চরের ০৭ টি মর্মান্তিক ঘটনা অর্ন্তভুক্ত করেছিলাম।

ল্যাপটপ ঘাঁটতে যেয়ে পুরোনো এই লেখাগুলো চোখে পড়লো। এর মধ্যে তিনটি লেখার খসড়া বিভিন্ন সময় অনলাইনে প্রকাশ করেছিলাম।

এর মধ্যে একটি ছিল, ১৪ বছরের কিশোর শহীদ জামালকে নিয়ে। চট্টগ্রাম কলেজিয়েটে স্কুলে পড়তো ছেলেটা। মুক্তিযুদ্ধের সসস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেবার জন্য বাড়ি পালিয়েছিল। এ.কে. খান মোড়ে বিহারীদের হাতে ধরা পড়ে যায়।

সারারাত চলে পাকি-বিহারী-বাঙালি দোসরদের পাশবিকতার চর্চা। পরদিন সকালে জামালের বাবা- ছোট ভাইসহ ওকে জবাই করা হয় হালিশহরের চুনা ফ্যাক্টরী মোড়ে।

যে জায়গায় ওকে জবাই করা হয়, ওটা বড় একটা খালের ধার। ওই জায়গা দিয়ে সচরাচর আমি যাই না। বাহনে চড়ে হোক কিংবা হেঁটে, আমার কেন জানি মনে হয়, জামালের রক্ত পাড়িয়ে যাচ্ছি।

কৃতজ্ঞতা বলেন আর যাই বলেন, আজ যা কিছু ভালো আছি, তা কেবলই এই জামালরা দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছিল বলে, স্বাধীন দেশ পেয়েছি বলে।

অথচ, কি সহজে সেই প্রজন্মের খন্দকার সাহেবরা বদলে যান, দেশের ক্ষতি করেন।

বলে ফেলেন- বঙ্গবন্ধু জয় পাকিস্তান বলেছেন। খন্দকার সাহেবের এই কথা অবশ্য গায়ে লাগেনি। এই প্রপোগান্ডা বহু পুরোনো। যারা পঁচে যায়, তারা এসব চর্বিত চর্বন ঘেঁটেই নিজের দুর্গন্ধ বাড়ায়।

কি বুঝাতে চেয়েছিলেন খন্দকার সাহেব?
বঙ্গবন্ধু পাকি-প্রেমী ছিলেন?

কাজী নুরুজ্জামানও একই দাবি করেছিলেন, তবে, তিনি কেন বঙ্গবন্ধু এই কথা বলতে পারেন, তার একটি যুক্তি দিয়েছিলেন।
দৈনিক যুগান্তরে (০৭.০৩.২০১১) সাংবাদিক আতাউস সামাদ লিখেছিলেন, বঙ্গবন্ধু "জীয়ে পাকিস্তান" বলেছিলেন। তিনি যুক্তি দিয়েছেন, বঙ্গবন্ধু বুঝাতে চেয়েছেন, পাকিস্তানের যে অংশ থাকবে, তা যেন টিকে থাকে।

যাই হোক, এনিয়ে তেমন মাথা-ব্যাথা হয়নি। এই প্রপোগান্ডার জবাবও বহু আদিকাল থেকে দিয়ে আসা হয়েছে।
এছাড়া, এই কথা বাবা বলে থাকলেও, তাতে তাঁর পাকি-প্রীতি প্রকাশ পায় না, এটা বাস্তবতার নিরিখে ও কর্মের যাচাইয়ে অসম্ভব বিষয়।

০৭ মার্চের ভাষণের আগের ঘটনা সম্পর্কে আতিকুর রহমানের "মুক্তিযুদ্ধের অপ্রকাশিত কথা" বইতে মুক্তিসংগ্রামে জড়িত মানুষদের রেফারেন্স দিয়ে বলা আছে, কিভাবে স্বাধীনতার ও স্বাধীনতা ঘোষণার কৌশলগত প্রস্তুতি বাবার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিচ্ছিল।

এতগুলো মানুষের বক্তব্যকে মিথ্যে বলে, আপনার রেফারেন্স ছাড়া বলা কথায় বিশ্বাস করবো?

আপনার আপত্তিকর দাবির সবই শুনেছি, এরকম কথা প্রচলিত ছিল জাতীয়; এতো শুনেছি আর প্রচলিতের ব্যাপার হয়ে গেলে। এভাবে কি ইতিহাস হয়?

খন্দকার সাহেবের যে কথায় বেশি আপত্তি ঠেকেছে, তা হলো- মুক্তিবাহিনীর উপ-প্রধান হয়ে তিনি বলছেন- মুক্তিযুদ্ধের জন্য আমাদের প্রস্তুতি ছিল না।

আমি কিছু নাম বলি, মনে পড়ে কিনা দেখুন তো-
ইস্ট বেঙ্গল লিবারেশন ফ্রন্ট, জনসংঘ, বঙ্গবাহিনী, অপূর্ব সংসদ, ঢাবির সলিমুল্লাহ হলে প্রতিষ্ঠিত "বেঙ্গল লিবারেশন অ্যাসোসিয়েশান", ছাত্রলীগের স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ, নিউক্লিয়াস।

মনে পড়ে খন্দকার সাহেব?
কি সহজে, জিয়া-জলিল-মুশতাকদের দলে ভীড়ে গেলেন?

রাতে ঘুমোতে পারেন দাদু?
যশোরের বস্ত্রহীন বেয়নেটের আঘাতে রক্তাক্ত ধর্ষিতা সেই নারীর ছবি চোখে ভাসে না?
আমোদের জন্য বন্য প্রাণী শিকারের মত বাঙালিরা মারা হয়েছিল, সেই দৃশ্য চোখে ভাসে না দাদু?
ময়মনসিংহে এক গর্ভবতী মা'কে বেয়নেট চার্জ করে হত্যা করা হয়, যৌনি দিয়ে অর্ধেক বেরিয়ে আসা বেয়নেট দিযে খোঁচানো সন্তানের রক্তাক্ত দেহগুলো সৃত্মিতে আসে না?
মাত্র ৪৩ বছর!
এর মধ্যেই সব গিলে ফেললেন?

দাদু,
আমাদের জন্ম স্বাধীনতার অনেক পড়ে।
আমরা তো বিডিআর মাঠে আমাদের স্বজনের রক্তের গন্ধ পাই, ওই মাঠের কাঁদায় হাত বুলিয়ে স্বাধীনতা অনুভব করার চেষ্টা করি, বাঙালির পঁচে যাওয়া মাংশের গন্ধ পাই, বাঙালির দেহের গন্ধ পাই, আজাদী বাজারে হারিয়ে যাওয়া স্বজনের সন্ধান করি, কুমিল্লার সীমান্তে শহীদ হওয়া মুক্তিযোদ্ধার বজ্রকন্ঠে বলা "জয় বাঙলা" শুনতে পাই, রাজশাহীতে বুকে মুখে মাটি জড়িয়ে ব্রাশ ফায়ারের সামনে দাঁড়ানো সেই যুবকের "জয় বাঙলা" শুনতে পাই, আমরা তো আমাদের মায়ের যৌনি ছেঁড়ার যন্ত্রণার বুক কাঁপানো চিৎকার শুনতে পাই।

তারপরও, কি করে পারেন?
কি করে?
কি করে?
কি করে?

ভুল তো মানুষ করে, লোভও মানুষ করে।
নিজের ভুলগুলো স্বীকার করে, মাফ চেয়ে নিবেন, এই আশাটুকু করি দাদু।
বাঙালির অনেক দয়া দাদু।
বাঙালি আজমকে পালতে পারলে, আপনাকে মাফও করে দিতে পারবে।





.

Comments

Popular posts from this blog

মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতনে পাকিস্তানি মানস

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে চীনের ভূমিকা ও ভাসানীর দায়

অপারেশন সার্চলাইটঃ একটি পরিকল্পিত গণহত্যার সূচনা