একাত্তরের পাতা থেকে, পর্ব-০২


একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল সসস্ত্র যোদ্ধাদেরকে সামষ্টিকভাবে মুক্তিবাহিনী বলা হয়।

সদস্যদের ব্যাকগ্রাউন্ডের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকার মুক্তিবাহিনীকে দুটি ভাগে ভাগ করেছিল-

এক. নিয়মিত বাহিনী [ পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী, আধা-সামরিক বাহিনী ও পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত বাঙালি ]।

ভারত সরকার নিয়মিত বাহিনীকে "মুক্তিফৌজ" বলে সম্বোধন করতো।


তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের (ইবিআর) ছয়টি ব্যাটালিয়নে প্রায় পাঁচ হাজার, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসে (ইপিআর) প্রায় ষোল হাজার, পুলিশ বাহিনীতে প্রায় পঁয়তাল্লিশ হাজার বাঙালি সদস্য ছিলেন।

একাত্তরের ২৫ মার্চ শেষ প্রহরে বাংলাদেশে পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম "জাতি-নিধন অভিযান" শুরু করে পাকিস্তান, টার্গেট বাঙালি। এই চরম দু:সময়ে ইবিআর, ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা বিদ্রোহ করেন। এই সময়ের কিছু সাহসী বিদ্রোহী সেনা অফিসারদের কথা না বললেই নয় মেজর রফিকুল ইসলাম, মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ, মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ।

পাকিস্তান বাহিনী কর্তৃক ২৫ মার্চ রাতে শুরু হওয়া গণহত্যায় প্রাণ হারান ইবিআর, ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত অসংখ্য বাঙালি সৈন্য ও অফিসার; রংপুর ক্যান্টনম্যান্ট, সৈয়দপুর ক্যান্টনম্যান্ট, পিলখানা পুলিশ লাইন, ভাটিয়ারি ক্যান্টনম্যান্টে বাঙালি অফিসার, সৈন্য ও তাঁদের পরিবারের লাশে পা দেয়ার স্থানটুকু ছিল না।

দুই. গণবাহিনী [ বেসামরিক বাঙালি, সহজকথায় আমজনতা ]

ভারত সরকার গণবাহিনীকে এফএফ (ফ্রিডম ফাইটার্স) বলে সম্বোধন করতো।

০২.

২৫ মার্চের রাত থেকেই বিচ্ছিন্নভাবে সারা বাঙলায় পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়।

পরবর্তীতে, ০৪ এপ্রিল সিলেটের হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ম্যানেজার বাংলোতে জেনারেল এম এ জি ওসমানীর নেতৃত্বে খালেদ মোশাররফ, কে এম সফিউল্লাহ, সি আর দত্ত সহ কয়েকজন বাঙালি সেনা অফিসার যুদ্ধ পরিচালনা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। সংগঠিত মুক্তিযুদ্ধের সামরিক পদক্ষেপের সূচনা হয়। এর কিছুদিন পর, মধ্য এপ্রিল মুজিবনগর সরকার মুক্তিবাহিনীর একটি কাঠামো ঘোষণা করে।

একাত্তরের মধ্য জুলাইয়ে মুজিবনগর সরকার বাঙালি সেনা অফিসারদের একটি বৈঠক আয়োজন করে, যাতে সেক্টর, উপ-সেক্টর, ব্রিগেড, গেরিলা বাহিনী, গণবাহিনী, রণকৌশল, রাজনীতি তথা মুক্তিযুদ্ধের সামরিক ও সামগ্রিক পরিকল্পনা নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয় এবং একটি রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়; দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত এই রূপরেখার অধীনে যুদ্ধ পরিচালনা করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধে সর্বমোট সেক্টর ছিল ১১ টি, উপ-সেক্টর ছিল ৬৯ টি, ০৩ টি ব্রিগেড ফোর্স (কে, এস, জেড ফোর্স) ছিল।

এই সময় মুক্তিবাহিনীতে ছিলেন প্রায় ১,৩০,০০০ গেরিলা (গণবাহিনী), প্রায় ১৮,০০০ সৈন্য, ১৫০ জন সেনা অফিসার।

মুক্তিবাহিনী ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধে কিছু স্বাধীন গেরিলা বাহিনী ছিল; এদের মাঝে টাঙাইলের কাদের বাহিনী (প্রায় ১৭,০০০ সদস্য), ময়মনসিংহে মেজর আফসারের নেতৃত্বে আফসার ব্যাটালিয়ন (প্রায় পাঁচ হাজার সদস্য), বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের হেমায়েত উদ্দিনের নেতৃত্বে হেমায়েত বাহিনী (প্রায় ছয় হাজার সদস্য) উল্লেখযোগ্য।

এছাড়া একাত্তরে বামদের কিছু গেরিলা বাহিনী ছিল; তবে, এদের সাথে মুজিবনগর সরকারের আদর্শ ও পথপরিক্রমার ভিন্নতা ছিল।

মুক্তিযোদ্ধাদের আরেকটি বিশেষ বাহিনীর কথা উল্লেখ করতে হয়, তা হলো- বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সেস (মুজিব বাহিনী)। মুক্তিযুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সম্ভাব্য বিকল্প নেতৃত্বের প্রয়োজন মোকাবেলার জন্য আওয়ামী লীগ ও এর ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মীদের নিয়ে এই বাহিনী গঠিত হয়। শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, তোফায়েল আহমদ ও আবদুর রাজ্জাক ছিলেন এই বাহিনীর মূল কেন্দ্রীয় কমান্ড এবং শেখ ফজলুল হক মনি ছিলেন অধিনায়ক। এই বাহিনীতে ১৯ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমান্ডের অধীন চারটি সেক্টরে প্রায় পাঁচ হাজার মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল উবানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে দেরাদুন পাহাড়ি এলাকায় এ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। মুজিব বাহিনী গেরিলা রণকৌশলে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত ও তুলনামূলকভাবে উন্নত অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ছিল। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গন ও ঢাকার আশে পাশে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বেশ কিছু দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করে এই বাহিনী। এখানে, আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে হয়, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার পূর্বে স্বাধীনতা সংগ্রামের যে পথপরিক্রমা, তাতে মুজিব বাহিনীর সংগঠক ও সদস্যদের কেন্দ্রীয় ভূমিকা ছিল।

সূত্র:

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র, নবম খন্ড।
দ্য এভিডেন্স, খন্ড-২, লেফট্যান্ট জেনারেল মীর শওকত আলী।
অ্যা টেইলস অব মিলিয়ন, মেজর রফিকুল ইসলাম।
মূলধারা ৭১, মইদুল হাসান।
যুদ্ধে যুদ্ধে স্বাধীনতা, মেজর নাসির উদ্দিন।
বাংলাদেশ ১৯৭১, খন্ড-২, আফসান চৌধুরী।
বাংলাপিডিয়া।


Facebook Post

Comments

Popular posts from this blog

মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতনে পাকিস্তানি মানস

কল্পিত বিহারি গণহত্যাঃ একাত্তরের পরাজিত শক্তির অপকৌশল

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে চীনের ভূমিকা ও ভাসানীর দায়