সহিংসতার এই কালো উৎসব বন্ধে জনতাকেই এগিয়ে আসতে হবে

সারাদেশের হাসপাতালগুলোর বার্ণ ইউনিটগুলো পেট্রোল বোমায় দগ্ধ মানুষে ভর্তি, তাদের আহাজারিতে ভারী হয়ে আছে চারপাশ।
আচ্ছা, ভাবা যায়, কোন ধরণের মানুষ এই ধরণের হীন জঘন্য কাজ করতে পারে!
আমরা নৃশংস মানুষকে পশু বলে গাল দিই কিন্তু এসব পেট্রোল বোমাহামলাকারীদের পশু বলা যেন প্রাণীকুলের অপমান করা।

হিসেব অনুসারে, বিএনপি-জামাত ও তাদের মিত্রদের ডাকা চলমান টানা ৩৪ দিনের এই হরতাল-অবরোধে এই পর্যন্ত পেট্রোল ও ককটেল বোমা হামলায় মারা গেছে ৫১ জন নিরীহ মানুষ।
এ যেন আগুনে পুড়িয়ে নরহত্যার কালো উৎসব চলছে সারা দেশে।

পেট্রোল বোমায় দগ্ধ আড়াই বছরের শিশু সাফির আহমেদ

কারা এই ভয়ংকর কাজ করছে?

এই পর্যন্ত পেট্রোল ও ককটেল বোমা হামলা করতে গিয়ে যারা জনতা ও পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে, এরা সকলেই বিএনপি-জামাতের কর্মী। কমিটিতে পদ পাবার লোভে, পরকালে জান্নাতের লোভ দেখিয়ে বিএনপি-জামাতের নেতারা তাদের কর্মীদের সাধারণ জনগণের উপর বোমা হামলা করতে উদ্বুদ্ধ করে।
আমরা শুনেছি বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের ফাঁস হয়ে যাওয়া ফোনালাপ, যেখানে তিনি সাধারণ মানুষের উপর হামলা করার জিনিসপত্রের সরবরাহের কথা বলা হচ্ছিল।
আমরা বিএনপি চেয়্যারপার্সনের ফাঁস হওয়া ফোনালাপ শুনেছি, যেখানে তিনি ঢাকা, চট্টগ্রাম সহ সারা দেশের বিএনপি নেতাদের সহিংসতা করার হুকুম দিচ্ছেন।
বর্তমানে চলমান সহিংসতা যে বিএনপি-জামাত ও তাদের মিত্রদের নেতাকর্মীরা করছে, তা প্রমানিত সত্য।

কেন বিএনপি-জামাত জনগণের বিরুদ্ধে এই ভয়ংকর সহিংসতা করছে?

একাত্তরে বাঙালি গণহত্যার নৃশংস উৎসবে পাকিস্তানীদের অন্যতম মিত্র ছিল জামাত।  
মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ মানুষ হত্যা ও চার লক্ষ নারীর ধর্ষনের অন্যতম কারিগর এই জামাত; যারা বাংলাদেশকে তালেবান-আইএস ঘরানার রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়।

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্য বন্ধ করে দিয়েছিল, বন্দী যুদ্ধাপরাধীদের মুক্ত করে দিয়েছিল, সংবিধান পরিবর্তন করে স্বাধীনতা বিরোধীদের-জাতির পিতার হত্যাকারীদের বাংলাদেশে পুর্নবাসিত করেছিল।

বিএনপি ৯১-তে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসার পর যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজমকে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনেছিল, সে সময় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য চলমান আন্দোলনকে বানচাল করতে চেয়েছিল, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গণআদালতে সাথে জড়িতদের রাষ্ট্রদ্রোহীতার মামলা সহ নিপীড়ন-হয়রানি করেছিল, গোলাম আজমের আগমন ঠেকানোর মিছিলে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির মিছিলে গুলি চালিয়ে বাঙালি হত্যা করেছিল।

বিএনপি পুনরায় ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে তাদের দেশবিরোধী কাজ পুরোদমে চালিয়ে গিয়েছিল; লুটতরাজ-দুনীর্তি-দেশের অর্থ পাচার সহ সংখ্যালঘু ও স্বাধীনতার পক্ষের মানুষদের খুন-ধর্ষন-দেশ ছাড়া করেছিল, সৃষ্টি করেছিল জেএমবি, মদদ দিয়েছিল জঙ্গিবাদে।

আর বর্তমানে এই বিএনপি-জামাত যখন বুঝতে পারলো, জনসমর্থিত আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতা হটানো যাবে না, জননিন্দিত বিএনপি-জামাতের রাজনৈতিক অস্তিত্ব হুমকির মুখে; ঠিক তখনই গণতন্ত্রের ধোঁয়া তুলে দেশকে অস্থিতিশীল করে দেয়ার গর্হিত চেষ্টা চালাচ্ছে এই বিএনপি-জামাত।
পেট্রোল ও ককটেল বোমা মেরে মানুষকে পুড়িয়ে সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে, পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে সাধারণ জনতার মালিকানাধীন যানবাহন, ধ্বংস করা হচ্ছে রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পদ।  
এ নি:সন্দেহে জনগণের উপর বিএনপি-জামাতের ক্ষোভের বহি:প্রকাশ; কারন, জনগণ বিএনপি-জামাতের মত ধর্মান্ধ-তালেবানী-সন্ত্রাসী-ধান্ধাবাজ দলের সাথে আর নেই।  
জনগণ চায় রাষ্ট্রের উন্নতি, সমৃদ্ধি, স্বচ্ছলতা; জনগণ চায় না দেশটা বিএনপি-জামাতের হাতে যাক আর তালেবান-আইএসে পরিণত হোক।

দেশের জনগণের সমর্থন যখন বিএনপি পেল না, তখন তারা নতুন আর্ন্তজাতিক নোংরামির আশ্রয় নিল; বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ'র সাথে ফোনালাপ নিয়ে মিথ্যাচার, ছয় জন মার্কিন সিনেটরের সই জাল করার মত নোংরামি এই দেশের জনগণ দেখেছে।
এইসব নোংরামি করে বিএনপি-জামাত শুধু বাংলাদেশ ও তার জনগণকে বিশ্বমন্ডলে ছোটই করলো।

এই বিএনপি-জামাত নামক মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী এই অপচক্র চায় বাংলাদেশকে বাংলাস্তান বানাতে।
তারা চায় তালেবান শাসিত আফিগানিস্তান ও আইএস শাসিত ইরাক-সিরিয়ায় মত দেশ সম্পূর্ণ অস্থিরতার দিকে চলে যাক আর এতেই তাদের স্বার্থবাদী উদ্দেশ্য হাসিল হয়।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী বিএনপি-জামাত মূলত: সুবিধাবাদী সুযোগসন্ধানী নিম্নবর্গের মানসিকতার লোকেদের নিয়ে গড়ে উঠা একটি শ্রেণী; এরা একাত্তরে পাকিস্তানের পক্ষে ছিল, কারন এরা ভাবতে পারেনি শক্তিশালী পাকিস্তানের সাথে প্রায় নিরস্ত্র বাঙালি পেরে উঠবে।
স্বাধীনতার পর এই কুচক্রী শ্রেণীটি তাদের স্বার্থ আদায়ের পথের কাঁটা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করেছিল।
জনগণের ধর্মীয় আবেগ ও জাতীয়তাবাদী চেতনাকে পুঁজি করে, ধর্মকে পণ্য বানিয়ে বিক্রি করে স্বার্থবাজদের নিয়ে দলভারী করে বিএনপি-জামাত নামক এই নোংরা দলটি সেই '৭৫ থেকে আজ পর্যন্ত দেশ ও জনগণের ক্ষতি করে আসছে; তাদের উদ্দেশ্য একটিই দেশের ক্ষমতা দখল করা ও অস্থিরতা সৃষ্টি করা, যাতে লুটপাট করতে, পেট পূঁজো করতে সুবিধে হয়।

তবে কি বিএনপি-জামাতের এই সহিংসতা চলতেই থাকবে, আমরা সাধারণ মানুষরা কি শুধু মরতেই থাকবো, মার খেতেই থাকবো?

আমাদের আশাহত হবার কোন কারন নেই।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আমরা বাঙালি, আমরা বীরের জাতি, আমরা রক্তের দামে স্বাধীনতা কিনেছি, কখনোই কোন অপশক্তি আমাদের বেশিদিন দাবিয়ে রাখতে পারেনি।
বর্তমানে জনগণ তার ভালোটি বুঝে, সত্যটি বুঝে; জনগণ জানে, বর্তমান সরকার এরশাদের স্বৈরসরকার নয়, বর্তমান সরকার ৯৬'র অবৈধ সরকার নয়; আর ঠিক সেকারনেই জনগণ বর্তমানে বিএনপি-জামাতের সরকার পতন আন্দোলনে কোন অংশগ্রহন করেনি বরং সারাদেশে জনতা যখনই যেখানে পেট্রোল-ককটেল বোমাবাজদের পাচ্ছে, ধরে ধোলাই দিচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দিচ্ছে।
বিএনপি-জামাতের এই সন্ত্রাসী কার্যক্রম তখনই পুরোদমে নি:শেষ হয়ে যাবে, যখন সর্বস্তরের জনগণ এই সন্ত্রাসী অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে।
এইসব বোমাবাজদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে, প্রয়োজনে প্রতিরোধ কমিটি করুন, এলাকায় এলাকায় পাহারা বসান, সন্দেহভাজনদের তল্লাসী করুন।
বোমাবাজরা বাহির থেকে আসে না, এরা আমাদেরই এলাকার বাসিন্দা, এদের গতিবিধির উপর নজর রাখুন, যখন কোন অসঙ্গতি দেখবেন, তখনই এদের আটকাবেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেবেন।

প্রশ্ন আসতে পারে, সব কাজ যদি জনগণই করে, তবে রাষ্ট্রের কাজ কি?

আমরা শত সমস্যায় জর্জরিত রাষ্ট্র, আর্থিকভাবেও আমরা সামলম্বী নই, প্রয়োজনের তুলনায় আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য সংখ্যা অনেক কম।
তাই, রাষ্ট্র সব জায়গা একই সময়ে ইচ্ছা থাকা সত্বেও নিরাপত্তার বলয়ের মাঝে রাখতে পারে না।
তারপরও রাষ্ট্র তার সামর্থ্য মত আমাদের নিরাপত্তা বিধান করার চেষ্টা করছে।
দেশটা যেহেতু আমাদের, তাই আমাদেরও এগিয়ে আসতে হবে।
রাষ্ট্রের সামর্থ্য কম বলে রাষ্ট্র ও সরকারকে গালমন্দ করার কোন মানে হয় না।
উপরে যেমনটি বলেছি, তেমনি যদি আমরা পাড়া-মহল্লার দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিই, তবে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ করতে সুবিধে হবে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হাইওয়েতে নিরাপত্তা দেবার কাজ আরো ভালো মত করতে পারবে।

আমাদের ফিরে যেতে হবে একাত্তরের সময়ে, যখন বাঙালি সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ হয়েছিল।
সমৃদ্ধির জন্য, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বিএনপি-জামাতের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সংগ্রামে সরকারের পাশে দাঁড়াতে হবে, দেশদ্রোহীদের বিষদাঁত ভেঙে দিতে হবে।
তবেই, বর্তমানে বিএনপি-জামাতের চলমান যে দানবীয় কার্যক্রম, চিরতরে তার সমাপ্তি হবে।
স্বাধীনতা বিরোধী, ধর্মান্ধ অপশক্তি এই বিএনপি-জামাত চক্রের এই সহিংসতার কালো উৎসব বন্ধে  ৫২, ৬৬, ৬৯, ৭০, ৭১, ৯০, ৯৬, ১৩'র মত জনতাকেই এগিয়ে আসতে হবে।

|| জয় বাঙলা, জয় বঙ্গবন্ধু ||

________________________________________________________________________________

১৫/০২/২০১৫ তারিখে ঢাকা থেকে প্রকাশিত জাতীয় দৈনিক 'আজকের পত্রিকা'য় এই প্রবন্ধটি ছাপা হয়েছে। * প্রবন্ধটি পড়তে চাইলে, কাগজের পত্রিকার 'চতুর্থ পৃষ্ঠা' দেখতে পারেন। * অনলাইন লিংক: http://ajkerpatrika.com/open-air/2015/02/15/21228 অথবা, http://ajkerpatrika.com/open-air/2015/02/15/21228/print * ই-পত্রিকা লিংক: http://ajkerpatrika.com/epaper/?archiev=yes&arch_date=15-02-2015&page=04

Comments

Popular posts from this blog

মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতনে পাকিস্তানি মানস

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে চীনের ভূমিকা ও ভাসানীর দায়

অপারেশন সার্চলাইটঃ একটি পরিকল্পিত গণহত্যার সূচনা