মুক্তিযুদ্ধের বিদেশী বন্ধু: কিথ ওয়াটারহাউজ


ছবি: John Hedgecoe
কিথ ওয়াটারহাউজ একজন ব্রিটিশ লেখক; কলামিস্ট, উপন্যাসিক ও নাট্যকার হিসেবে বেশি পরিচিত।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালির উপর পাকিস্তানী ও তাদের দেশীয় দালালদের বর্বরতা সৃষ্টি করেছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়, যা সারা বিশ্ববাসীকেই হতবাক করে দিয়েছিল। সেই সময় বাঙালির পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন বিশ্বের নানান প্রান্তের মানুষ; তেমনই একজন লেখক কিথ ওয়াটারহাউজ।

কিথ ওয়াটারহাউজ বাংলাদেশের জন্মসূত্র একাত্তরের সময় আমাদের পাশে ছিলেন; কলম ধরেছিলেন বাংলাদেশে পাকিস্তানীদের গণহত্যার বিরুদ্ধে, বাংলাদেশের পক্ষে, ভারতে আশ্রিত এক কোটি শরণার্থীদের জন্য।

১৯৭১ সালের ০৯ জুন যুক্তরাজ্যের প্রথম সারির দৈনিক মিররের প্রথম পাতায় কিথের একটি কলাম প্রকাশিত হয়।

শিরোনাম- Wednesday's Child
কলামের বিষয়বস্তু ছিল- বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালির উপর পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর নৃশংস বর্বরতা ও ভারতে আশ্রিত এক কোটি বাঙালি শরণার্থীর অমানবিক জীবন-যাপন এবং বাংলাদেশ-বাঙালির পাশে দাঁড়ানোর আহবান।

'বুধবারের শিশু' শিরোনামের সেই কলামে কিথ বলেন-

"এই কলামটি আগামী দিন প্রকাশিত হবার কথা ছিল কিন্তু ২৪ ঘণ্টা অনেক লম্বা সময় এবং আমাদের অপেক্ষা করা মানেই হয়তো আরো মানবিক বিপর্যয় ঘটে যাওয়া আর জীবন বাঁচানোর মতো মানবিক কাজে দেরী করতে নেই।

পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই; পত্রিকার সম্পাদকীয় ও কার্টুনিস্টের তুলিতে উঠে এসেছে মানব ইতিহাসের অন্যতম বিপর্যয়ের কথা। আমরা দেখেছি পাকিস্তানীদের ভয়ংকর বর্বরতা থেকে বাঁচতে ভারতে পালিয়ে আসা বাংলাদেশীদের ছবি- উলঙ্গ ক্ষুধার্ত শিশু, ভিক্ষার থালা হাতে হতবাক বৃদ্ধের অসহায় দৃষ্টি।

শব্দ দিয়ে আমরা বিভিন্ন মানবিক বিপর্যয়কে বুঝাতে পারি- দুর্ভিক্ষ, ভূমিকম্প, মহামারী কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান যে ভয়ংকর পরিস্থিতি, তার জন্য শব্দ খুঁজে পাওয়া ভার।"

এরপরের অংশে কিথ একটু ভালো থাকার জন্য, মানবিক জীবনের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন পিছিয়ে পড়া দেশ থেকে যুক্তরাজ্যে আসা অভিবাসীদের জীবনের উদাহরণ তুলে ধরে বাংলাদেশে ও ভারতের বাঙালি শরণার্থী শিবিরে সংঘটিত ভয়ংকর মানবিক বিপর্যয় রোধে আর্থিক সহযোগিতা করার জন্য ব্রিটিশদের এগিয়ে আসার আহবান জানান।

সেই সময়ে চলমান স্নায়ুযুদ্ধে উন্নত বিশ্বের ক্ষমতার লড়াইয়ের অপব্যয়, চ্যারেটি সংগঠনগুলোর দ্বন্দ্ব ও দায়িত্বহীনতাকে প্রশ্ন-উত্তরের মধ্য দিয়ে ব্যঙ্গ করেন কিথ।

"# প্রশ্ন: আমেরিকা ও রাশিয়া চন্দ্রাভিযানে এত অর্থ ব্যয় করে কিন্তু পৃথিবীকে বসবাসযোগ্য করার পিছনে তাদের বাজেট থাকে অপ্রতুল।

উত্তর: আমি জানি না।

# প্রশ্ন: কোন দেশে বোমা ফেলতে যদি অনুমতি না লাগে কিন্তু জীবন রক্ষাকারী ভ্যাক্সিনেশন পাঠাতে কেন অনুমতি লাগে? কেন রেডক্রস, রেডক্রিসেন্ট, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের ডাক পড়ার আগ পর্যন্ত মানবিক বিপর্যয় রোধে এগিয়ে যায় না?

উত্তর: আমি জানি না।

# প্রশ্ন: কেন মানবিক বিপর্যয়ে কেন দাতব্যটি সংগঠনগুলো আলাদা করে কাজ করে? মানবিক বিপর্যয় রোধে কেন সব ফান্ডের সমন্বয়ে বৈশ্বিক একক কোন তহবিল নেই?

উত্তর: আমি জানি না।

# প্রশ্ন: সরকার সাহায্য পাঠানোর প্রক্রিয়া কেন এত ধীর?

উত্তর: সরকারের কথা ভুলে যান। সরকারের চেয়ে বরং এই পৃথিবীর প্রতি আমাদের দায়িত্ব বেশি।"

এরপর কিথ লিখেন-

"এইসব প্রশ্নের কোন উত্তর সন্তুষজনক খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই, প্রশ্ন করে, উত্তর খুঁজে সময় নষ্ট করবেন না।
বরং বাংলাদেশের মানবিক বিপর্যয় ঠেকাতে এখনই এগিয়ে আসুন, আজ দুপুরের আগেই অংশগ্রহণ করুন।
খাম-কলম নিন, খামের উপর নিচের ঠিকানা লিখুন-


SAVE-A-LIFE
Box 189,
Daily Mirror,
1, Thavies Inn,
London, S.O.1 P1DA

আপনার হয়তো পছন্দের কোন দাতব্য সংস্থা আছে, যার ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছেন না।
হয়তো ভাবছেন, এই অনুদানের কতটুকু প্রশাসনিক কাজে ব্যয় হচ্ছে আর কতটুকু ভুক্তভোগীরা পাচ্ছে।
এই দ্বন্দ্বগুলো জাতিসংঘের জন্য ছেড়ে দিন এবং খামের উপর তিন পেনির একটি টিকিট লাগিয়ে এক পাউন্ডের একটি নোট উপরের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিন।

যদি আপনার কাছে এক পাউন্ড না থাকে, তবে জোগাড় করুন, দরকার হলে ধার করুন, বাড়ি ভাড়া বা গ্যাসের বিলের জন্য তুলে রাখা অর্থ থেকে নিন, পকেট মানি থেকে বা ধূমপানের খরচ বাঁচিয়ে বা কিছু বিক্রি করে বা বন্ধক রেখে হলেও এক পাউন্ড জোগাড় করুন আর সেই এক পাউন্ড খামের ভেতর ভরে পোস্ট করে দিন; হয়তো আপনার এই এক পাউন্ডই বাঁচিয়ে দেবে একটি জীবন।

এই মানবিক কাজের জন্য ধন্যবাদ প্রত্যাশা করবেন না; কারণ, এই রক্তাক্ত পৃথিবীকে বাসযোগ্য করার দায়িত্ব আপনার-আমারই।"

এখানেই শেষ হয়েছিল কলামটি।

ছবিসূত্রঃ গার্ডিয়ান
কলামটি সাড়া ফেলেছিল পুরো যুক্তরাজ্যে।
মাত্র দু'দিনের মাথায় মানে ১১ জুন পত্রিকাটি জানায় বাংলাদেশের শরণার্থীদের সহায়তা করার জন্য ৩৩,৪০০ পাউন্ড জমা পড়েছে।

কিথ ওয়াটার হাউজের পুরো নাম কিথ স্পেন্সার ওয়াটারহাউজ, জন্মেছিলেন ইংল্যান্ডের পশ্চিম ইয়র্কশায়ারে।
ফেব্রুয়ারি, ২০০৪ এ ব্রিটিশ জার্নালিজম রিভিউ'র আয়োজিত পাঠক ভোটে কিথ ব্রিটেনের সবচেয়ে প্রশংসিত কলামিস্ট হিসেবে নির্বাচিত হন।

২০০৯ সালের ০৪ সেপ্টেম্বর, বাংলাদেশ ও বাঙালির এই অকৃত্রিম বন্ধু ৮০ বছর বয়সে ঘুমের মধ্যে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় আমাদের জন্মবন্ধু কিথ স্পেন্সার ওয়াটারহাউজকে স্মরণ করছি।

* মিররের রিপোর্টটি ভাবানুবাদ করা হয়েছে।

* সূত্র:

০১. দ্য ডেইলি মিরর, ০৯ জুন সংখ্যা, ১৯৭১। [ ছবি ] [ পিডিএফ ]
০২. Yorkshire Evening Post

Comments

Popular posts from this blog

মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতনে পাকিস্তানি মানস

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে চীনের ভূমিকা ও ভাসানীর দায়

অপারেশন সার্চলাইটঃ একটি পরিকল্পিত গণহত্যার সূচনা