শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক শিবসাধন চক্রবর্তী

একাত্তরে পরিকল্পিতভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল। পাকিস্তান ও তাদের দালালরা মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাতের জন্য বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের দায়ী করতো তারা বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের আওয়ামীলীগ ও ভারতের দালাল হিসেবে দেখতো। ওরা মনে করতো বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি প্রভাবিত অবিশুদ্ধ মানুষ। তাই একাত্তরের শুরু হতেই বুদ্ধিজীবী হত্যা করেছিল পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ও তাদের দালালরা।

বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের আরেকটি কারণ হলো- বাঙালি জাতিকে মেধাশূণ্য করা। কারণ, মেধাশূণ্য করা গেলেই বাঙালিকে দাস বানিয়ে রাখা যাবে, পূর্ব-পাকিস্তান তথা বাংলাদেশকে পশ্চিম পাকিস্তানের উপনিবেশ হিসেবে রাখা যাবে। এই চিন্তাগুলো থেকে পাকিস্তানিরা ও তাদের দালালরা বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। এই গর্হিত কর্মে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে অংশগ্রহণ করেছিল দালালরা তথা, রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বাহিনী।
বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সাংবাদিকদের প্রতি আক্রোশ বেশি ছিল পাকিস্তানিদের। কারণ, একাত্তরে পূর্ব-পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমের উপর আরোপিত কঠোর সেন্সরকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জীবনের মায়া না করে বাঙালি সাংবাদিকরা বিশ্ব সংবাদমাধ্যমে প্রতিনিয়ত পাকিস্তানিদের বর্বরতা, বাঙালি গণহত্যা, মুক্তিযোদ্ধাদের কার্যক্রম, পূর্ব-পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত তথ্য সরবরাহ করেছিলেন। মূলত: এইসব দুঃসাহসী বাঙালি সাংবাদিকদের কারণেই পূর্ব-পাকিস্তানে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ও তাদের দালালদের দ্বারা বাঙালি গণহত্যার কথা বিশ্ববাসী জানতে পারে।
শহীদ সাংবাদিকদের কয়েকজন হলেন- সেলিনা পারভিন, শহীদুল্লাহ কায়সার, শহীদ সাবের, সিরাজুদ্দীন হোসেন, নিজামুদ্দীন আহমদ, শিবসাধন চক্রবর্তী, খোন্দকার আবু তালেব, সৈয়দ নাজমুল হক, লাডু ভাই, আবুল বাশার, গোলাম মোস্তফা, চিশতী শাহ হেলালুর রহমান, মুহম্মদ আখতার প্রমুখ।
এই ধারাবাহিক লেখায় নতুন প্রজন্মের পাঠকদের জন্য একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিকদের কয়েকজনের কথা তুলে আনার চেষ্টা করেছি মাত্র।
আজ লিখছি একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক শিবসাধন চক্রবর্তীকে নিয়ে; তাঁর ডাকনাম শিবু; জন্ম নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের বিরাহীমপুর গ্রামে ১৯৪৬ সালের ২৫ মার্চ। তাঁর মা সুনীতিপ্রভা চক্রবর্তী, বাবা হরেন্দ্র কুমার চক্রবর্তী। তাঁর বাবা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন; ০২ সেপ্টেম্বর, তাঁকে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ও রাজাকাররা বিরাহীমপুরে হত্যা করে।
খুব ভালো ছাত্রছিলেন শিবসাধন চক্রবর্তী; মেট্রিক পরীক্ষাতে তিনি নোয়াখালী জেলায় প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন, ইন্টারে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞানে ভর্তি হয়েছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থায় শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন; কুমিল্লার বাঞ্ছারামপুর নওয়াব সিরাজুল ইসলাম কলেজে শিক্ষকতা করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন শেষ করে ১৯৬৯ সালে সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হন, সহ-সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকায়।
পাকিস্তান অবজারভারে যোগ দেবার পর তিনি ঢাকার গোপীবাগে থাকতেন। পরে ৭০'এর ডিসেম্বরে গোপীবাগের বাসা ছেড়ে তিনি রমনা কালীমন্দির এলাকার একটি মেসে উঠেন।
২৫ মার্চ কালরাত্রি হতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী সারা বাংলাদেশে বাঙালি গণহত্যা মেতে উঠে। পুরো দেশ তখন মৃত্যুপুরী, রাজধানী ঢাকার সর্বত্র বাঙালির লাশ। যেখানে পাচ্ছে গুলি করে, বেয়নেট চার্জ করে পাকিস্তানীরা বাঙালিদের হত্যা করছে। আওয়ামীলীগার, পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনকারী ও হিন্দুদের বিশেষ টার্গেট করেছিল পাকিস্তানীরা; হত্যার মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার পরিকল্পনা করেছিল এবং সে অনুসারে হত্যাযজ্ঞ করছিল।
২৭ মার্চ, ১৯৭১
সারা শহরে সান্ধ্য আইন জারি করা হয়েছে। পাকিস্তান বাহিনী নির্বিচারে বাঙালি গণহত্যা করছে।
তখন মধ্যরাত।
পাকিস্তান সেনারা রমনা কালী মন্দির ও শ্রী শ্রী মা আনন্দময়ী আশ্রম আক্রমণ করেছে। যাকে সামনে পাচ্ছে, তাকে গুলি করছে, বেয়নেট চার্জ করছে। প্রাণ বাঁচাতে মানুষরা মন্দির আর আশ্রমের ভেতর আশ্রয় নেয়। পাকিস্তান বাহিনী মন্দির আর আশ্রমে প্রবেশ করে; মন্দিরের মূর্তিগুলেো ভেঙে ফেলে, আশ্রমে থাকা বই-ছবি নষ্ট করে। মন্দির ও আশ্রমে আশ্রয় নেয়া মানুষদের ধরে এনে বাইরে লাইন করে দাঁড় করানো হয়। পাকিস্তানীর জোর করে সবাইকে কলেমা পড়ায়। তারপর পুরুষদের ব্রাশফায়ার করে, মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য বেয়নেট চার্জ করে; লাশগুলো স্তূপ করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। শিশুদের আছড়ে, বেয়নেট চার্জ করে, আগুনে ফেলে দিয়ে হত্যা করে পাকিস্তানিরা। নারীদের জন্য অপেক্ষা করছিল আরো ভয়াবহতা; বয়স্কাদের রাইফেলের বাঁট দিয়ে আঘাত করে, বেয়নেট চার্জ করে; অপেক্ষাকৃত কম বয়স্কা, যুবতী, তরুণী, কিশোরীদের ধরে নিয়ে যায়।
সেই রাতে রমনা কালী মন্দির ও শ্রী শ্রী মা আনন্দময়ী আশ্রমে পাকিস্তানিরা যে নরহত্যা-নির্যাতনের বর্বর উৎসব করেছিল, তাতে শহীদ হয়েছিল সাংবাদিক শিবসাধন চক্রবর্তী। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল ২৫ বছর ০২ দিন।
শহীদ সাংবাদিক শিবসাধন চক্রবর্তী ছিলেন নিভৃতচারী, স্বল্পভাষী; অফিসে-ব্যক্তিজীবনে ছিলেন চুপচাপ, কর্মঠ একজন মানুষ।
স্মৃতিচারণ করতে যেয়ে তাঁর সহকর্মী সাংবাদিক মাশুক উল হক বলেন: ২৬ মার্চ শিবসাধন চক্রবর্তী অফিসে এসেছিলেন। তাঁকে দেখে অবাক হই। তাঁকে নিরাপদে কোথাও চলে যেতে অনুরোধ করি। তিনি বলেছিলেন, তাঁর কাছে টাকা নেই। তাই, একাউন্টসে খৌঁজ নিতে এসেছেন। রমনা কালীমন্দির এলাকায় তাঁকে থাকতে বারণ করি কিন্তু ওখানেই তিনি ফিরে গিয়েছিলেন, হয়ত তাঁর যাবার জায়গা ছিল না।
শহীদ সাংবাদিক শিবসাধন চক্রবর্তীর ছোটভাই বর্তমানে সাংবাদিক তরুণ তপন চক্রবর্তী স্মৃতিচারণ করে বলেন: মুক্ত, স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন শিবসাধন চক্রবর্তী। বঙ্গবন্ধুর আহবানে সাড়া দিয়ে দেশের জন্য লড়তে চেয়েছিলেন।
কিন্তু কি নির্মম বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হলো শহীদ সাংবাদিক শিবসাধন চক্রবর্তীকে! পাকিস্তানীরা সেদিন লাশগুলো আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছিল, শনাক্ত করা যায়নি এই নিভৃতচারী, স্বল্পভাষী, কর্মঠ, দেশপ্রেমিক এই মানুষটির লাশ।
শহীদ সাংবাদিক শিবসাধন চক্রবর্তীকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করি!

Comments

Popular posts from this blog

মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতনে পাকিস্তানি মানস

কল্পিত বিহারি গণহত্যাঃ একাত্তরের পরাজিত শক্তির অপকৌশল

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে চীনের ভূমিকা ও ভাসানীর দায়