চিরশ্রদ্ধা জেনারেল কৃষ্ণা

এই বছর আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু- জেনারেল কে ভি কৃষ্ণা রাও। মুক্তিযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর (ভারতীয়) এই সিনিয়র সেনা অফিসারের অবদান অসামান্য। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তাঁর অবদান বর্ণনা করা ছাড়া লেখা সম্ভব নয়।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বাংলাদেশকে সহায়তা করার জন্য ভারত এগিয়ে আসে।
কে ভি কৃষ্ণা রাও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি তখন ভারতীয় মেজর জেনারেলভারতীয় সেনাবাহিনীর ০৮ মাউন্টেন ডিভিশনের জিওসিএই ০৮ মাউন্টেন ডিভিশন তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল।

ছবিঃ সংগ্রহীত

মিত্রবাহিনীর মেজর জেনারেল কে ভি কৃষ্ণা রাওয়ের নেতৃত্ব সিলেট তথা বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল পাকিস্তান সৈন্যদের দখলদারিত্ব হতে মুক্ত হয়। তিনি ঢাকায় পাকিস্তানের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব ও সফল অধিনায়কত্বের জন্য তাঁকে ভারত সরকার 'পরম বিশিষ্ট সেবা পদকেভূষিত করে।

প্রদীপ বড়ুয়ার 'দ্য স্টেট এট ওয়ার ইন সাউথ এশিয়াগ্রন্থে মেজর জেনারেল (তৎকালীন) কেভি কৃষ্ণা রাও সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ

মিত্রবাহিনীর ল্যাফটেনেন্ট জেনারেল স্বগত সিং মেজর জেনারেল কে ভি কৃষ্ণা রাওকে তার ০৮ মাউন্টেন ডিভিশন নিয়ে শমশেরনগর বিমানঘাঁটি ও সিলেটের মৌলভীবাজার এলাকা দখলে রাখতে আদেশ দেন।মুক্তিবাহিনী সহ মিত্রবাহিনীর পঞ্চম গুর্খা ব্যাটালিয়ন ও মে. জে. কে ভি কৃষ্ণা রাওয়ের ০৮ মাউন্টেন ডিভিশনের তীব্র আক্রমণে ২৭ পাকিস্তান ব্রিগেড ছাতক পর্যন্ত পিছিয়ে যায়।এরপরই সিলেটের ২০২ পাকিস্তান ব্রিগেড ও মৌলভিবাজারের ৩১৩ পাকিস্তান ব্রিগেড যেন ২৭ পাকিস্তান ব্রিগেডকে সহায়তা করতে এগিয়ে না আসতে পারেসেজন্য মে. জে. কে ভি কৃষ্ণা রাও তার ০৮ মাউন্টেন ডিভিশন নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেন এবং একের পর এক যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পিছু হটতে থাকে।মে. জে. কে ভি কৃষ্ণা রাওয়ের অসাধারণ অধিনায়কত্বে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর যৌথ সৈন্যদল আখাউড়া-ভৈরব বাজার পর্যন্ত অঞ্চল পাকিস্তানি দখলদারিত্ব হতে মুক্ত করে।

ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মনোহর পাররিকর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জেনারেল কে ভি কৃষ্ণা রাওয়ের ভূমিকা নিয়ে বলেনঃ

"দেশ (ভারত) একজন শ্রেষ্ঠ সামরিক নেতাকে হারিয়েছেতিনি একজন স্বপ্নদ্রষ্টাসফল অধিনায়ক ও একটি প্রজন্মের ভারতীয় সামরিক সদস্যদের অনুপ্রাণিত করেছেনযিনি আশির দশকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন শুরু করেছিলেন। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে (বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ) তাঁর অবদান শ্রদ্ধার সাথে চিরস্মরণীয়।"


​ছবিঃ আব্বাস আত্তার; একদম বামে এ. কে. খন্দকার পেছনে দাঁড়ানো মেজর জেনারেল কৃষ্ণা রাও

জেনারেল কে ভি কৃষ্ণা রাও ঢাকায় পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। আব্বাস আত্তারের তোলা পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের সেই বিখ্যাত ছবিতে তিনি আছেন।


কে ভি কৃষ্ণা রাও ১৯২৩ সালের ১৬ জুলাই ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ ভারতে সেনাবাহিনীতে কমিশন্ড অফিসার ক্যাটাগরীতে যোগদান করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি বার্মা ও বেলুচিস্তানে এবং ৪৭'এ দেশবিভাগের সময় তিনি পাঞ্জাবে কর্মরত ছিলেন।
দেশবিভাগের ভারতীয় সেনাবাহিনী যোগদান করেন এবং ১৯৪৭-৪৮ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রথম কাশ্মির যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৯-৫১ সালে তিনি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ডিফেন্স একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা প্রশিক্ষক১৯৫২-৫৫ সালে নয়া দিল্লিতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদর দফতরে জেনারেল স্টাফ অফিসার (গ্রেড-২)১৯৬০-৬৩ সালে জম্মু-কাশ্মিরে জেনারেল স্টাফ অফিসার (গ্রেড-০১) এবং ১৯৬৮-৬৯ সালে তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদর দফতরে মিলিটারি অপারেশনস বিভাগের উপ-পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৬৯ সালে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হন এবং ১৯৭০-৭২ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতের মণিপুর ও নাগাল্যান্ড রাজ্যে কর্মরত ছিলেনএসময় ১৯৭১ সালে তিনি মিত্রবাহিনীর একজন কমান্ডিং জেনারেল হিসেবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৭৪ সালে তাঁকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর লেফট্যান্ট জেনারেল পদে১৯৭৯ সালে জেনারেল পদে ও ১৯৮১ সালে চিফ অব আর্মি স্টাফ পদে উন্নীত করা হয়। ১৯৮১ সালের জুন হতে ১৯৮৩ সালের জুলাই পর্যন্ত তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১৪ তম প্রধান হিসেবে দায়িত্বপালন করেন। ১৯৮৩ সালে সামরিক বাহিনী হতে অবসর গ্রহণের পর ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময় তিনি ভারতের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গর্ভনরের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
৩০ জানুয়ারি২০১৬ তারিখে ৯২ বছর বয়সে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম বন্ধু জেনারেল কে ভি কৃষ্ণা রাও দিল্লীতে অবস্থিত সামরিক হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

চিরশ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতায় বাঙালির হৃদয়ে চিরভাস্মর হয়ে থাকবেন বাংলাদেশের মুক্তিরবন্ধু ভারতীয় সেনাবাহিনীর এই জেনারেল।

না ফেরার দেশে ভালো থাকুন জেনারেল কৃষ্ণা...

Comments

Popular posts from this blog

মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতনে পাকিস্তানি মানস

কল্পিত বিহারি গণহত্যাঃ একাত্তরের পরাজিত শক্তির অপকৌশল

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে চীনের ভূমিকা ও ভাসানীর দায়