স্মরণের জানালায় জীবনানন্দ





অনন্ত জীবন যদি পাই আমি - তাহ'লে অনন্তকাল একা
পৃথিবীর পথে আমি ফিরি যদি দেখিব সবুজ ঘাস
ফুটে উঠে - দেখিব হলুদ ঘাস ঝরে যায় - দেখিব আকাশ।
ইশশ!
সত্যিই যদি কবি অনন্তকাল পেতেন...

জীবনানন্দ দাশ; বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি।

তিনি জন্মেছিলেন এপার বাঙলায়; বরিশালে ১৮৯৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি, বাঙলা ১৩০৫ সালের ০৬ ফাল্গুন।
কবির ডাকনাম ছিল মিলু।
তাঁর মা কুসুমকুমারী দাশ বাঙলার সুপরিচিত কবিতা "আদর্শ ছেলে"র রচয়িতা। এই কবিতাটি পড়েনি এমন বাঙালি বোধ করি নেই।

১৯১৯ সালে তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। কবিতার নাম "বর্ষা আবাহন"।
সেই থেকে শুরু এরপর আর থেমে থাকেনি তাঁর কবিতার কলম।
তবে, জীবদ্দশায় তাঁর অনেক কবিতা ব্যাপক সমালোচনার শিকার হয়; পরবর্তীতে, এই কবিতাগুলোয় বাঙলা সাহিত্যের অলংকার হিসেবে গণ্য হয়েছে।
১৯৩১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর 'ক্যাম্পে' কবিতা; বাঙলা সাহিত্য তখনও শ্লীল-অশ্লীলতার সংজ্ঞা ঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারেনি; কবির কবিতাটি অশ্লীলতার সিলগালায় চাপা পড়ে।

তাঁর আর্থিক জীবন কেটেছে চরম দরিদ্রতা আর ছুটোছুটির মধ্যে; উত্থান-পতনের ডামাডোল থেকে তিনি বের হতে পারেননি।
শিক্ষকতা ছিল তাঁর আজন্মের পেশা।
১৯২৭/ ১৯২৮ সালে কিছুদিন তিনি খুলনার ছোট্ট শহর বাগেরহাটের প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজে শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন।

১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ০৯ মে ঢাকায় ব্রাহ্ম সমাজের রামমোহন লাইব্রেরিতে বরিশালের কন্যা লাবণ্য দেবীর সাথে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হন।
লাবণ্য-মিলুর ঘর আলো করেছিল মঞ্জুশ্রী, সমরানন্দ।

'কবিতা পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যাতে (পৌষ ১৩৪২ সংখ্যা-১৯৩৪/১৯৩৫) আঠারো লাইনে লেখা কবির শ্রেষ্ঠ কবিতা 'বনলতা সেন' প্রকাশিত হয়।

চল্লিশের দশকের শেষের দিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়; কবির এই সময়ের কবিতাগুলোতে যুদ্ধের ছাপ স্পষ্ট।

পঞ্চাশের দশকে যুদ্ধ শেষ হবার ক্ষণকাল পরেই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে দেশভাগের তোড়জোড় শুরু হয়।
ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙা শুরু হয়।
জীবনানন্দ দাশ সব সময়ই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সপক্ষে সোচ্চার ছিলেন।
কলকাতায় যখন ১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে কবি তখন লেখেন "১৯৪৬-৪৭" কবিতা।
দেশভাগের এই অন্ধকার সময়ে কবি কলকাতায় স্থায়ীভাবে বাস করা শুরু করেন।

দেশভাগের সাত বছরের মাথায় ঘটে মহাদুর্ঘটনা...

১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর কলকাতার বালিগঞ্জে এক ট্রাম দুর্ঘটনায় কবি মারাত্মক আহত হন।
অনেক চেষ্টা-চরিত করা হয় কিন্তু ২২ অক্টোবর, ১৯৫৪, রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে কলকাতার শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে বনলতা সেনের প্রেমিক বসুন্ধরার মায়া ছেড়ে শঙ্খ-শালিকের বেশ ধরতে চলে যান।

আবদুল মান্নান সৈয়দ, ডাঃ ভূমেন্দ্র গুহ সহ অনেকে ধারণা করেছেন কবি আত্মহত্যা করেছেন।
কবির আপনজনদের ধারণা, জাগতিক নিঃসহায়তা কবির জীবনস্পৃহা শূন্য করে দিয়েছিল; ক্রমেই মৃত্যুচিন্তায় তিনি আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন, প্রায়ই ট্রাম দুর্ঘটনায় মৃত্যুর কথা ভাবতেন।
গত ১০০ বছরে কোলকাতায় ট্রাম দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া একমাত্র ব্যক্তি হলেন কবি জীবনানন্দ দাশ।
ট্রাম লাইন পার হবার সময় কবির দুই হাতে দুই থোকা ডাব ছিল।
কবি কি তাহলে জগতের সামনে হতে সত্যিটি আড়াল করতে চেয়েছিলেন?

জীবনানন্দ দাশের লেখালেখির মধ্যে আছে ১৪টি উপন্যাস, ১০৮টি ছোটগল্প এবং অসংখ্য কবিতা।
উপন্যাস ও ছোটগল্প তিনি জীবদ্দশায় প্রকাশ করেননি।
মাঝে মাঝে দু'একটি গদ্যজাতীয় লেখা প্রকাশিত হলেও জীবদ্দশায় তিনি কবি হিসেবেই স্বীকৃত ছিলেন।

জীবিত অবস্থায় স্বীকৃতি পাননি তিনি কিন্তু বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ কবিদের আসনে তিনি আজ অধিষ্ঠিত।

শঙ্খ-শালিকের মাঝে কবিকে খুঁজে বেড়াই অামরা।
কবি আমাদের মাঝ হতে হারিয়ে যাননি।
বাঙালি মাত্রই নিজের মত করে কবির বনলতা সেনকে খুঁজে বেড়ায়।

ওপারে কোন জীবন থেকে থাকলে ভালো থাকুন প্রিয় কবি...

Comments

Popular posts from this blog

মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতনে পাকিস্তানি মানস

অপারেশন সার্চলাইটঃ একটি পরিকল্পিত গণহত্যার সূচনা

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে চীনের ভূমিকা ও ভাসানীর দায়