আমি হিমালয় দেখিনি কিন্তু শেখ মুজিব দেখেছি

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর নামের শুরুতে ‘জাতির পিতা’ ও ‘বঙ্গবন্ধু’ -এই দুটো প্রশংসাসূচক সম্বোধন যুক্ত হয়েছে, কারন তিনি পরাধীনতা, শোষণ, বঞ্চনা হাত হতে উদ্ধার পেতে আমাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ বৃটিশ অধীনতা হতে মুক্ত হয়েছিল বটে কিন্তু পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পায়নি। দীর্ঘ ২৪ বছর পরাধীনতার শৃঙ্খলে আটকে ছিল বাঙালি, পদে পদে ছিল বঞ্চনা, শোষণ, নির্যাতন। পাকিস্তান আমাদের তাদের অনুগত দাস বানিয়ে রাখতে চেয়েছিল। আমাদের কষ্টার্জিত অর্থ খরচ করা হতো পশ্চিম পাকিস্তানে, উন্নত হতো পশ্চিম পাকিস্তান আর বাঙালি ভুখা-নাঙ্গা হয়ে থাকতো। ৪৭’এ স্বাধীন-সার্বভৌম আত্মপ্রকাশ করেও আমরা হয়ে গিয়েছিলাম পাকিস্তানের উপনিবেশ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালি পাকিস্তানের প্রভুত্ব, শোষণ, বঞ্চনা, নির্যাতন, পরাধীনতা হতে মুক্তি পেয়েছিল; বাঙালি অর্জন করেছিল স্বাধীন-সার্বভৌম একটি দেশ, নিজেদের জন্য একটি রাষ্ট্র, বাঙালির একমাত্র রাষ্ট্র। আর একারণেই বাঙালি তাঁকে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতায় উপাধি দিয়েছিল জাতির পিতা, বঙ্গবন্ধু।



পৃথিবীতে যাদের হাত ধরে একটি জাতি শোষণ, বঞ্চনা, পরাধীনতা হতে মুক্তি পেয়েছে, তাদেরকে সেই জাতির পিতা উপাধিতে সম্মানিত করা হয়েছে; যেমন- জর্জ ওয়াশিংটন, জন এডামস, থমাস জেফারসন, জেমস ম্যাডিসন, আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন, জেমস মুনরো এবং বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনকে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের জাতির পিতা উপাধিতে সম্বোধন করা হয়;  তুরস্কে কামাল আতাতুর্ককে তুর্কি জাতির পিতা উপাধিতে সম্বোধন করা হয়; চীন ও তাইওয়ানে সান ইয়েৎ-সেনকে জাতির পিতা উপাধিতে সম্বোধন করা হয়; ভারতে মহাত্মা গান্ধীকে জাতির পিতা উপাধিতে সম্বোধন করা হয়; ইন্দোনেশিয়ায় আহমদ সুকর্ন ও মুহম্মদ হাত্তাকে জাতির পিতা উপাধিতে সম্বোধন করা হয়; মালয়েশিয়ায় আবদুর রহমানকে জাতির পিতা উপাধিতে সম্বোধন করা হয়। এভাবে করে পৃথিবীর সব জাতি যার নেতৃত্বে পরাধীনতা, শোষণ হতে মুক্তি পেয়েছে, তাদের জাতির পিতা উপাধিতে সম্মানিত করেছে। ঠিক একই কারনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের জাতির পিতা।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা। তাঁর নেতৃত্বে বাঙালি স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে। বঙ্গবন্ধু শুধু বাঙালির কাছে নন, বিশ্বের কাছেও একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা; তাঁর দৃঢ়-সরল-সৎ-সাহসী ব্যাক্তিত্ব ও রাজনৈতিক দূরদর্শীতা ও প্রজ্ঞা মুগ্ধ করেছে বিশ্বকেও, স্থান করে নিয়েছেন তিনি বিশ্ব দরবারে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন তাঁর সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতা। তৎকালীন বৈশ্বিক ব্যাক্তিত্ব তাঁর নেতৃত্ব, প্রজ্ঞা ও ব্যাক্তিত্বের প্রশংসা করে গেছেন। তাঁদের কেউ বঙ্গবন্ধুকে ‘প্রতিষ্ঠান’ বলে বর্ণনা করেছেন, কেউ বা তাঁকে ‘বিপ্লব’-‘আন্দোলন’ বলে বর্ণনা করেছেন, কেউবা তাঁর তুখোড় বাগ্মীতার প্রশংসা করেছেন। বঙ্গবন্ধুর সাত মার্চের ভাষণ, যাঁর মাধ্যমে তিনি বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা অর্জনের শেষ ধাপ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে বলেছিলেন; এই ভাষণ স্থান করে নিয়েছে বিশ্বের প্রেরণাদায়ী ভাষণের একটি হিসেবে। খ্রিস্টপূর্ব ৪৩১ থেকে ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সেরা ভাষণ নিয়ে উই শ্যাল ফাইট অন দ্য বিচেস- দ্য স্পিচেস দ্যাট ইন্সপায়ার্ড হিস্টোরি নামে ২২৩ পৃষ্ঠার একটি বইটি সঙ্কলন করেছেন জ্যাকব এফ ফিল্ড। বইটির ২০১ পৃষ্ঠায় দ্য স্ট্রাগল দিস টাইম ইজ দ্য স্ট্রাগল ফর ইনডিপেন্ডেন্স’ শিরোনামে স্থান পেয়েছে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ।



শুধু বঙ্গবন্ধুর ভাষণই নয়, বিশ্ব ব্যাক্তিত্বরা ও মিডিয়া তাঁর বিশাল ব্যাক্তিত্ব ও তুখোড় রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় হয়েছেন পঞ্চমুখ। বঙ্গবন্ধু ছিলেন জাতিগত ও মানব মুক্তির আন্দোলনের শ্রেষ্ঠ একজন নেতা। শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব পালন করা মন্ত্রী লক্ষণ কাদিরগামার এপ্রসঙ্গে বলেছেন, “দক্ষিন এশিয়া মানবসভ্যতাকে দিয়েছে যুগপরিবর্তনকারী মহান শিক্ষক, দার্শনিক, রাষ্ট্রনায়ক, নেতা, রাজনীতিবিদ ও যোদ্ধা দিয়েছে। শেখ মুজিব এই মহান শ্রেনীর একজন কালশ্রেষ্ঠ মানুষ”। ব্রিটিশ মানবাধিকার আন্দোলনের নেতা লর্ড ফ্যানার ব্রুকওয়ে এনিয়ে বলেছেন- “জর্জ ওয়াশিংটন, মহাত্মা গান্ধী, ডি ভ্যালেরা হতে শেখ মুজিব অনেক বড় নেতা”। একই ধরণের কথা বলেছেন ভারতের উচ্চপদস্থ কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মকর্তা বেদ প্রকাশ মারওয়া; তিনি বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বলেছেন- “পেশাগত জীবনে জওহরলাল নেহেরু, ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধী সহ অনেক চমৎকার ব্যাক্তিত্বের মানুষের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে এবং আমাকে স্বীকার করতে হবে, তাঁদের মধ্যে শেখ মুজিব ছিলেন সবচেয়ে চমৎকার ও তুখোড় চরিত্র”। সাংবাদিক সিরিল ডান বঙ্গবন্ধুর ক্যারিশমাটিক চরিত্র, নেতৃত্ব ও জনগণের উপর তাঁর প্রভাব সম্পর্কে বলেছিলেন- “তিনি তার যুগের সুপারম্যান”।

১৯৪৭ সালে স্বাধীন-সার্বভৌমত্বের নাম দিয়ে জন্ম নেয়া পাকিস্তানে বাঙালিরা পরিণত হয় পশ্চিম পাকিস্তানিদের দাসে। দুঃখ-দুর্দশা-বঞ্চনা-নির্যাতনের এমন কোন ধাপ নেই, যার স্টীমরোলার বাঙালির উপর পাকিস্তানিরা চালায়নি। বঙ্গবন্ধু নিপীড়িত বাঙালির জাতির জন্য ছিলেন আর্শীবাদ, বাঙালি জাতির অধিকারের কন্ঠ, মুক্তির কন্ঠ। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের চট্টগ্রামে অবস্থানকারী আমেরিকান মিশনারী জিনাইন লকারবি বঙ্গবন্ধুকে বলেছেন- “বাঙালি জাতির ত্রাতা”।
বাঙালি জাতি স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অর্জন করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে। বাংলাদেশের জনগণের কাছে বঙ্গবন্ধু ছিল জাতীয় জীবনের একমাত্র আশা-ভরসা। বঙ্গবন্ধুর বসত ছিল বাঙালি জাতির হৃদয়ের মণিকোঠায়। ব্রিটিশ সাংবাদিক মার্ক ট্যালি প্রতি বাঙালি জাতির এই ভক্তি দেখে বলেছেন বলেছেন- “শেখ মুজিবের চমৎকার কন্ঠ, বাগ্মীতা বাঙালিদের কাছে সম্মোহনীর কাজ করতো।”
বাঙালি জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর গ্রহণযোগ্যতা শুধুমাত্র বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের সকল বাঙালির কাছেই আছে; তিনি বাংলাদেশের যেমন নেতা, তেমনি সকল দেশের সকল বাঙালির নেতা। এই বিষয়ে মিশরের সাংবাদিক হাসনাইন হাইকাল বলেছিলেন, “নাসের যেমন শুধু মিশর নয়, সমগ্র আরবজাতির নেতা; তেমনি শেখ মুজিবুর রহমান শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র বাঙালিজাতির নেতা। শেখ মুজিব হলেন বাঙালির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নায়ক।”



১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে নিরস্ত্র-নিরীহ বাঙালি জনতার উপর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গণহত্যা ও নির্যাতন অভিযান শুরু হয়। সেই সময় পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হবার আগে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করেন। দীর্ঘদিন ধরে বঙ্গবন্ধু স্ব-অধিকার অর্জনের যে পথ দেখিয়েছেন, সেই পথ অনুসরণ করে বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এনিয়ে নিউজউইক ম্যাগাজিনের ০৫ এপ্রিল, ১৯৭১-এ প্রকাশিত সংখ্যার প্রচ্ছদে বঙ্গবন্ধুর ছবি ছাপা হয় এবং তাঁর সম্পর্কে বলা হয়- “শেখ মুজিব হলেন রাজনীতির কবি"।
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দুরদর্শীতায় একাত্তরে আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের মূল পাথেয় হিসেবে কাজ করেছে। বঙ্গবন্ধু বুঝতেন পাকিস্তান কখনোই আমাদের অধিকার স্বীকার করবে না, সংঘর্ষ ছিল অনিবার্য। তিনি বুঝতেন শক্তিশালী হিংস্র পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ অসহায়। তিনি বুঝতেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে  আর্ন্তজাতিক বলয়ের সহযোগীতা তাঁর প্রয়োজন। কিন্তু এও তাঁর মাথায় ছিল যে, তৎকালীন শিতলযুদ্ধের কঠিন বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিবেশে সহযোগীতা পাওয়া সহজ বিষয় নয়; সবাই বিনিময় চায়, বৃহৎ শক্তিগুলো তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর আনুগত্য চায়। বঙ্গবন্ধু এমনভাবে এগোলেন যেন, স্বাধীনতা সংগ্রামে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা পাওয়া যায়, তবে তা কোন আনুগত্যের বিনিময়ে নয়। এবিষয়ে ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব জে, এন, দিক্ষীত বলেছেন- “শেখ মুজিব খুব পরিস্থিতি অনুধাবনে তুখোড় ও দুরদর্শী নেতা; তিনি এমনভাবে কাজ করতেন যেন বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষা হয়”।
বঙ্গবন্ধুর প্রদর্শিত পথেই বাঙালি জাতি স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছিল। এনিয়ে সন্দেহ বা দ্বিমতের কোন সুযোগ নেই। বঙ্গবন্ধুর ছিল নিঁখুত নেতৃত্ব যোগ্যতা। টাইম ম্যাগাজিনের ১৭ জানুয়ারি, ১৯৭২ তারিখে প্রকাশিত একটি ফিচার রিপোর্টে বঙ্গবন্ধুকে দক্ষিন এশিয়ার শ্রেষ্ঠতম একজন নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং বলা হয়- “এমনকি তাঁর নিন্দুকরাও তাঁর নেতৃত্বের প্রশংসা করে”।



বঙ্গবন্ধু ছিলেন বিশাল হৃদয় ও উঁচু মানসিকতার মানুষ। বাঙালি জাতিকে, বিশ্বমানবতাকে যেভাবে তিনি অনুভব করতে, তা সচরাচর দেখা যায় না। ১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ায় জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর সাথে কিউবার ফিদেল ক্যাস্ত্রোর দেখা হয় এবং তিনি বঙ্গবন্ধুর চারিত্রিক বিশালতার ইঙ্গিত করে বলেন, “আমি হিমালয় দেখিনি কিন্তু শেখ মুজিব দেখেছি।”
বঙ্গবন্ধুকে তৎকালীন বিশ্ব দেখতো একজন জননেতা হিসেবে, মানবমুক্তির আন্দোলনের নেতা হিসেবে; চমৎকার চরিত্র ও তুখোড় নেতৃত্বের গুণাবলীর অধিকারী বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে তাই শোকাতর হয়েছিল বিশ্ব। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের খবর শুনে ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ ও একসময়ের প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসন এক বাঙালি সাংবাদিককে লিখেছেন, “এই ঘটনা নিশ্চিতভাবে তোমাদের জাতীয় জীবনের জন্য তীব্রতর বেদনার কিন্তু আমার জন্য এটি ব্যাক্তিগতভাবে সীমাহীন বেদনার”।

এই যে আমরা বাঙালিরা আজ স্বাধীন দেশের নাগরিক, নিজেদের একটি আত্মপরিচয় আছে; এসব সবই অর্জিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে। তাঁর নিকট বাঙালির আজন্ম ঋণ। বাংলাদেশ ও বাঙালিকে বঙ্গবন্ধু নিজের অস্তিত্বের অংশ ভাবতেন, ভালোবাসতেন সন্তান স্নেহে। তা-ই যেন বাংলাদেশ, বাঙালি, বঙ্গবন্ধু তিনটি শব্দ পরস্পরের সাথে একাত্ম হয়ে আছে।

আজ ১৭ মার্চ, ২০১৬।
জাতির পিতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন।
শুভ জন্মদিন পিতা...
ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায় বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করছি।



সহায়ক সূত্রঃ

  • BSS - Global media dubbed Bangabandhu as ‘poet of politics’ - 18 Aug, 2014.
  • Daily Sun - "Sheikh Mujib stands higher than George Washington, Mahatma Gandhi" - 0August, 2015.

Comments

Popular posts from this blog

মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতনে পাকিস্তানি মানস

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে চীনের ভূমিকা ও ভাসানীর দায়

অপারেশন সার্চলাইটঃ একটি পরিকল্পিত গণহত্যার সূচনা