মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের সৃত্মি পাকিস্তানিদের প্রদান

১৯৭১ সালের ১৬ আগস্ট।
নৌ কমান্ডো মুক্তিযোদ্ধারা মংলা নৌ বন্দরে পাঁচটি পাকিস্তানিদের মিত্র বিদেশী জাহাজ ধ্বংস করে; এই জাহাজগুলোতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর জন্য যুদ্ধ পরিচালনার জন্য রসদ ছিল। ধ্বংসকৃত জাহাজগুলোর মাঝে আমেরিকান শিপিং প্রতিষ্ঠান M/S Inco Shipping Corporation-এর মালিকানাধীন S.S.Lightening নামে একটি জাহাজ ছিল। এই জাহাজে পাকিস্তানিদের জন্য অস্ত্র-গোলাবারুদ রাখা ছিল।


নৌ কমান্ডো মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমনে বিধ্বস্ত জাহাজ S.S. Lightening


১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর তৎকালীন বঙ্গবন্ধু সরকার বিধ্বস্ত S.S.Lightening জাহাজটিকে উদ্ধার করে। ১৯৭৪ সালে তৎকালীন নৌ পরিবহন মন্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম.এ.জি ওসমানী S.S.Lightening জাহাজটিকে মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ বলে ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু জাহাজটিকে সংস্কার করে ব্যবহার উপযোগী করার জন্য খুলনা শিপ-ইর্য়াডকে নির্দেশ দেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট প্রো-পাকিস্তানিদের হাতে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শহীদ হবার পর বাংলাদেশের চালচিত্র বদলে যায়। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনকারী বাংলাদেশ গণতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতা-সমাজতন্ত্র-বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে মূলভিত্তি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, তা বদলে যেয়ে প্রো-পাকিস্তানি নীতি চালু হয়, যার কু-ফলাফল আমরা আজো বয়ে চলেছি।

প্রো-পাকিস্তানি দখলদার শাসক জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৬ সালের মার্চ মাসে একজন পাকিস্তানি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ভাইকে তৎকালীন ০৬ কোটি টাকা মূল্যমানের S.S. Lightening জাহাজটি উপহার দেয়া হয়। পাকিস্তানি নাগরিক মোহাম্মদ ভাই চট্টগ্রামের জুবিলি রোডে অফিস নিয়ে বাংলাদেশে ব্যবসায় করতো। পরবর্তীতে জাহাজটি M/S Ship Scrap Traders নামে একটি জাহাজ ভাঙার কোম্পানিকে দেয়া হয়; তারা জাহাজটিকে ভেঙে ফেলে।

পাকিস্তানি ব্যবসায়ীকে জাহাজটি উপহার দেবার সময় এই জাহাজের সাথে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোন অনুমতি নেয়া হয়নি। এমনকি জাহাজটির উদ্ধার-মেরামত-সংরক্ষনে খুলনা শিপ-ইয়ার্ডের পাওনা তৎকালীন মূল্যমানের প্রায় ২১ লক্ষ টাকাও পরিশোধ করা হয়নি।

S.S. Lightening জাহাজটি মুক্তিযুদ্ধে আমাদের অর্জিত সম্পত্তি, মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিজয়ের প্রতীক, গর্ব-অহংকারের চিহ্ন অথচ স্বাধীন বাংলাদেশের ক্ষমতা দখলকারী প্রো-পাকিস্তানি শাসক জিয়াউর রহমান বাঙালি জাতির গর্বের এই প্রতীকটি পাকিস্তানি নাগরিককে তথা পাকিস্তানকে উপহার দেয়।
শুধু তাই নয়, জাহাজটিকে তারা জাহাজ-ভাঙা শিল্পে দিয়ে ভেঙে ফেলে অর্থাৎ, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গর্বের একটি চিহ্নকে বিনষ্ট করে ফেলা হয়।

জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সাথে যা করেছে, তাতে বাঙলা ও বাঙালির ইতিহাসে তার জায়গা একজন অসৎ, দুষ্কৃত ও ঘৃণিত ব্যাক্তি হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বিজয়ের একটি প্রতীককে মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত ও বাঙালির গণহত্যাকারী-ধর্ষক পাকিস্তানকে উপহার দেয়ার ঘটনা হতে বুঝতে পারা যায় জিয়াউর রহমান কতবড় বিশ্বাসঘাতক ছিলেন। 


সহায়ক সূত্রঃ Naval Commandos in the Liberation War

Comments

Popular posts from this blog

মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতনে পাকিস্তানি মানস

কল্পিত বিহারি গণহত্যাঃ একাত্তরের পরাজিত শক্তির অপকৌশল

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে চীনের ভূমিকা ও ভাসানীর দায়