তুরস্কে অভ্যুত্থান: কারণ, ব্যর্থতা ও পরিণতি

তুরস্ক সামরিক বাহিনীর একদল অফিসার ও সেনা ১৫-১৬ জুলাই, ২০১৬ তারিখে জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) হতে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়িপ এরদোগানের সরকারের বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থান পরিচালনা করে, যা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।


১৫ জুলাই মধ্যরাতের আগে তুরস্কের স্থলবাহিনী, বিমানবাহিনী ও সামরিক পুলিশের অভ্যুত্থানকারী দল ইস্তানবুল ও আঙ্কারার মূল পয়েন্টসমূহ, আতাতুর্ক আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর, তার্কিশ জেনারেল স্টাফের সদর দফতর, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সদর দফতর, প্রেসিডেন্টের বাসভবন, সংসদ ভবন ও বসফরাস প্রণালীর মূল ব্রিজগুলোতে অবস্থান নেয়। অভ্যুত্থানকারীরা জাতীয় টিভি মাধ্যম হতে অভ্যুত্থানের খবর প্রচার করে এবং অভ্যুত্থানের কারন হিসেবে এরদোগান সরকারের গণতন্ত্রের অপব্যবহার ও ধর্মনিরপেক্ষতাবিরোধী কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে।

অভ্যুত্থান শুরু হবার কিছুক্ষন ১৬ জুলাই রাত সাড়ে ১২ টার দিকে প্রেসিডেন্ট এরদোগান সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থান ঠেকাতে জনগণকে রাজপথে নেমে আসার আহবান জানায়; এরদোগানের এই আহবান মসজিদ ও একেপি পার্টির অফিসগুলো হতে প্রচার করা হয়। ঘন্টাখানেকের মাঝে একেপি পার্টির কর্মী-সমর্থকরা ইস্তানবুল-আঙ্কারার রাজপথে নেমে আসে। পরবর্তীতে সকাল ০৮ টা নাগাদ এরদোগান সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন নেয়।

সরকারি হিসেব মতে, অভ্যুত্থানের ফলে সংঘটিত সংঘর্ষে ১৬১ জন বেসামরিক জনতা ও ১০৪ জন অভ্যুত্থানকারী সদস্য সহ মোট ২৬৫ জন প্রাণ হারায়; আহত হয় ১৪৪০ জন। অভ্যুত্থানের দায়ে সামরিক বাহিনীর প্রায় ছয় হাজার সদস্যকে বন্দী করা হয়; এর মাঝে ০৪ জন জেনারেল ও ২৯ জন কর্নেল ছিলেন। অভ্যুত্থানে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে প্রায় তিন হাজার বিচারপতিকে দায়িত্বচ্যুত করা হয়েছে।

কামাল আতাতুর্কের প্রতিষ্ঠিত তুরস্ক রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র পরিবর্তন করে ক্রমেই রাজনৈতিকভাবে ইসলামিজমের দিকে ঝুঁকে পরা, ইসলামি সালাফি জঙ্গিসংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) সাথে বাণিজ্য-অস্ত্র সরবরাহ, একেপি’র কর্মী-সমর্থকদের প্রশাসনে চাকুরি প্রদান, দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ ছিল বর্তমানে ক্ষমতাসীন ডানপন্থী রাজনৈতিক দল একেপি’র এরদোগান সরকারের বিরুদ্ধে। অভ্যুত্থানকারীরা মোটাদাগে এসব বিষয়কে অভ্যুত্থানের কারন হিসেবে বর্ণনা করেছিল।

তাহলে প্রশ্ন আসে, আধুনিক তুরস্ক রাষ্ট্রের মূলনীতির পক্ষেই যদি অভ্যুত্থান হয়, তবে তা ব্যর্থ হলো কেন?

বেশ কয়েকটি কারন এর পিছনে চিহ্নিত করা যায়। শুধু যদি অভ্যুত্থান প্রক্রিয়ার গুণগত দিকের কথা বলি, তবে বলতে হয়, সামরিক বাহিনীর কর্তা-ব্যাক্তি, বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ ও আন্তর্জাতিক প্রভাববিস্তারকারী রাষ্ট্রগুলোর সাথে অভ্যুত্থানকারীদের সেভাবে যোগাযোগ বা সমর্থন ছিল না অর্থাৎ অভ্যুত্থানকারীরা ছিলেন এরদোগানবিরোধী বিভিন্ন পক্ষ হতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। অনেকপক্ষই এরদোগানের কার্যক্রমের বিরোধিতা করে, তার পতন চায়; তবে, ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ তুরস্কের সরকার পরিবর্তন সকলেই গণতান্ত্রিকভাবে চায়।

সামরিক বাহিনীর নিম্ন হতে মধ্য পদের অফিসাররাই মূলতঃ এই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে ছিল। অভ্যুত্থানকারীদের মূল নেতৃত্বে ছিলেন তার্কি বিমান বাহিনীর সাবেক কমান্ডার জেনারেল আকিন অজতুর্ক ও তার্কি সামরিক বাহিনীর আইন উপদেষ্টা বিভাগের সাবেক প্রধান কর্নেল মুহররম খোসে।

তার্কি সামরিক বাহিনীর উর্ধ্বতন অংশ বস্তুতঃ এই অভ্যুত্থান সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিলেন। যার ফলে, অভ্যুত্থানটিকে ঠিক সুসংহত বলা যায় না। তার্কি সামরিক  বাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ জেনারেল হুলুসি আকর, তার্কি ফার্স্ট আর্মি কমান্ডার জেনারেল উমিত দুনবার, জেনারেল জেকাই আকশাকালি সহ সিনিয়র অফিসাররা যাদের সেক্যুলার বলে পরিচিতি আছে, তারা সকলেই এই অভ্যুত্থানের বিষয়ে অন্ধকারে ছিলেন।

তুরস্কের সেক্যুলার বলে পরিচিত রাজনৈতিক দলগুলোও বলা যায় অভ্যুত্থান সম্পর্কে জ্ঞাত ছিল না। রিপাবলিকান পিপল’স পার্টি, ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট পার্টি ও পিপল’স ডেমোক্রেটিক পার্টি হলো এরদোগানের একেপি’র বিরোধী প্রধান তিন রাজনৈতিক দল; এই তিনটি দলই অভ্যুত্থানের বিরোধীতা করে বিবৃতি দিয়েছিল।

অভ্যুত্থান ব্যর্থ হবার পিছনে ডানপন্থী ইসলামিস্ট এরদোগান ও তার পূর্বসূরীদের বেশকিছু পদক্ষেপের বিষয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। নব্বইয়ের দশকের শেষার্ধ হতে সামরিকবাহিনীতে ধীরগতিতে একটি পরিবর্তন আনা হচ্ছিল। সামরিক বাহিনীতে ডানপন্থী মানসিকতার ব্যাক্তিদের নিয়োগ করা হচ্ছিল, ফলে অতি সেক্যুলার হতে সামরিক বাহিনীকে ধীরে ধীরে ডানপন্থার দিকে ধাবিত করার একটি প্রক্রিয়া চালু ছিল। এই পরিবর্তন প্রক্রিয়ার ফলাফল এরদোগান অভ্যুত্থানের সময় দেখা গেছে। সামরিক বাহিনীর উচ্চপর্যায় অভ্যুত্থানের সময় এরদোগানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছে এবং অভ্যুত্থানের সমর্থনে কোন সামরিক অফিসারকেই অভ্যুত্থানকারীদের সাথে যোগ দেয়ার ঘটনা ঘটেনি। এথেকে এবিষয়টি স্পষ্ট যে, সেক্যুলাররা দুর্বল হয়েছে তার্কি সামরিক বাহিনীতে।

সেক্যুলার সামরিক বাহিনীর বিপক্ষে ডানপন্থীরা দীর্ঘমেয়াদে আরো একটি কাজ সফলভাবে করেছিল; তা হলো- তুরস্কের সংখ্যাগরিষ্ট সুন্নী মুসলমানের ইসলামি চেতনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা। এরদোগানের ডানপন্থী একেপি জনগণকে এটি বুঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে, কামাল আতাতুর্কের সেক্যুলার তুরস্কে ইসলামি ভাবধারা বজায় রাখতে হলে একেপি’র কোন বিকল্প নেই, একেপি’র প্রতি সমর্থন করা বর্তমান বাস্তবতায় তুরস্কে ইসলামের ভাবধারা পুর্নবহালে জন্য অপরিহার্য। আর এর প্রয়োগ এরদোগান যথাযথভাবে করেছে। অভ্যুত্থান শুরু হবার পর এরদোগান একেপি’র নেতা-কর্মী-সমর্থকদের রাজপথে আসার আহবান জানায়। স্থানীয় পর্যায়ে একেপি’র নেতা-কর্মীরা আমজনতাকে এটি বুঝাতে সক্ষম হয় যে, তুরস্কে ইসলামি ভাবধারার বাহক একেপি’কে টিকিয়ে রাখা তাদের ধর্মীয় দায়িত্ব; এর জন্য একেপি’র নেতা-কর্মীরা মসজিদের মাধ্যমে ও ধর্মীয় ব্যাক্তিদের মাধ্যমে আহবান জানায়। এর ফলাফল হিসেবে আমরা দেখতে পাই, অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে রাজপথে তুরস্কের আমজনতার ঢল। তুরস্কের আমজনতার ঢলই মূলতঃ অভ্যুত্থানের ফলাফল নির্ধারণ করে দেয়, ডানপন্থী ইসলামিস্ট এরদোগানের গদি রক্ষা পায়।

এরদোগান ও ডানপন্থীরা এই অভ্যুত্থানের ব্যর্থতাকে পুরোদমে কাজে লাগাবে। ব্যর্থ এই অভ্যুত্থান তুরস্কের ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে আঘাত হানবে। এরদোগান নিজেই এর একটি ইঙ্গিত দিয়েছেন- “এই অভ্যুত্থান আল্লাহ’র পক্ষ হতে আমাদের জন্য আর্শীবাদ হিসেবে এসেছে; বিচারবিভাগ, প্রশাসন ও সামরিকবাহিনীকে শুদ্ধ করা হবে”।

১৫-জুলাইয়ের ব্যর্থ অভ্যুত্থান ছিল তুরস্কের ধর্মনিরপেক্ষতার মূলনীতিতে ফিরে যাবার একটি প্রয়াস কিন্তু জনগণের মাঝে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিতে না থাকার কারনে ইসলামী ভাবধারার আমজনতার চাপের মুখে ব্যর্থ হয় এই অভ্যুত্থান। আর এরফলে তুরস্কে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি ধরে রাখার অভিভাবক হিসেবে পরিচিত সামরিকবাহিনী কোণঠাসা হয়ে পড়বে। এরআগে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র ধরে রাখার জন্য ১৯৮০ ও ১৯৯৭ সালে সামরিকবাহিনী তুরস্কের সরকার কাঠামোয় হস্তক্ষেপ করেছিল। ডানপন্থীরা এই দুই ঘটনা হতে শিক্ষা নিয়েছিল আর এই শিক্ষার সফল প্রয়োগ করলো ১৫-জুলাইয়ের অভ্যুত্থান ব্যর্থ করার কাজে ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায়। উপরে সামরিক বাহিনীতে সেক্যুলারদের প্রভাব হতে ডানপন্থীদের প্রভাব বৃদ্ধির একটি প্রক্রিয়ার প্রতি ইঙ্গিত দেয়া হয়েছিল; এই প্রক্রিয়াটি এরদোগান সরকার এখন আরো স্পষ্টভাবে বাস্তবায়নের সুযোগ পেলো। সামরিক বাহিনীর সেক্যুলার নেতৃত্ব অচিরেই কাঠামোগত প্রক্রিয়ায় ডানপন্থীদের হাতে চলে যাবে, এটি নিঃসন্দেহে বলা যায়। শুধু সামরিক বাহিনী নয়, বিচারবিভাগ ও প্রশাসনে সেক্যুলারদের পরিবর্তে ডানপন্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।

রাজনৈতিক ও আর্দশিক বিরোধী দমনে এরদোগান ও ডানপন্থীরা এই ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সর্বোচ্চ ব্যবহার করবে, তা ইতিমধ্যেই এরদোগান সরকারের নানান কর্মকান্ড থেকে স্পষ্ট হয়ে গেছে। তুরস্কে এরদোগান ও ডানপন্থী তথা ইসলামিস্টদের একটি বড় বিপক্ষ হলো, বহুত্ববাদ ও উদারপন্থায় আস্থাশীল মুসলমানরা, বিশেষতঃ এখানে ফেতুল্লাহ গুলেনের অনুসারী হিজমেতিদের কথা বলা হচ্ছে।

ফেতুল্লাহ গুলেন
হিজমেতি একটি মুসলিম ধর্মীয় গ্রুপ, কিন্তু প্রথাগত ইসলামি সংগঠন হতে এর অনুসারী বা সদস্যরা এজন্যই আলাদা, কারন- এরা রাজনৈতিক, সামাজিক ও আদর্শগতভাবে বহুত্ববাদ ও উদারপন্থায় আস্থাশীল এবং প্রকারান্তে ধর্মীয় ভাবধারার রিভিশানিজমে সমর্থন করে। এই হিজমেতিরা একেপি’র মত ডানপন্থী তথা গণতন্ত্রের চাদরে থাকা প্রথাগত ইসলামিস্টদের মূল বিপক্ষ শক্তির একটি। ধারণা করা হয়, ২০১৪ সালে এরদোগান ও ডানপন্থীদের দুর্নীতির যে চিত্র জনসন্মুখে বেরিয়ে আসে, তার পিছনে হিজমেতিদের ভূমিকা ছিল। এরপরই এরদোগানের একসময়ের মিত্র হিজমেতি আন্দোলনের নেতা ফেতুল্লাহ গুলেন তুরস্ক ছেড়ে আমেরিকায় চলে যান। ১৫-জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের জন্য এরদোগান ফেতুল্লাহ ও হিজমেতিদের দায়ী করে আসছিল শুরু হতেই। এটি স্পষ্ট যে, এই ব্যর্থ অভ্যুত্থানকে কাজে লাগিয়ে হিজমেতিদের শায়েস্তা করতে পিছপা হবে না এরদোগান ও ডানপন্থীরা। এরই ফলস্বরূপ গুলেনের হিজমেতি আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে প্রায় ২,৭৪৫ জন বিচারপতিকে দায়িত্বচ্যুত করা হয়েছে এবং ১৮৮ জন বিচারপতিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ব্যর্থ এই অভ্যুত্থানকে ডানপন্থীরা বিচারবিভাগে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় বর্তমানে নগ্নভাবে কাজ করার জন্য ব্যবহার করছে।

সেক্যুলার ভাব-বলয়ে থাকা তুরস্ক বহুবছর ধরে ডানপন্থী তথা ইসলামি ভাবধারায় ফিরে আসার যে ধীর প্রক্রিয়ায় ছিল, তা এবার বেশ গতি পাবে। এই প্রক্রিয়ায় এরদোগান ও ডানপন্থীরা তাদের বহুদিনের লালিত স্বপ্ন সংসদীয় পদ্ধতি হতে এক্সিকিউটিভ প্রেসিডেন্সির মত গণতন্ত্রের পোষাকে একদলীয় শাসন ব্যবস্থার দিকে সাংবিধানিকভাবে তুরস্ককে নিয়ে যেতে পারে। সেনা-অভ্যুত্থানের বিপরীতে গণতন্ত্রকে রক্ষার অজুহাতে সেনাবাহিনী, প্রশাসন ও বিচারবিভাগে প্রচুর রদবদল করা হবে, যা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে; এসব বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আসীন হবে এরদোগান ও ডানপন্থার সমর্থকরা। পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে সংবাদমাধ্যম ও বাকস্বাধীনতার উপর প্রচ্ছন্ন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস চালানোর ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বিদ্যমান সন্ত্রাসদমন আইন সংস্কার করার কথাও উঠে এসেছে কিন্তু এতে ডানপন্থী উগ্ররা তথা ইসলামী জঙ্গিদের বদলে সেক্যুলার ও গণতন্ত্রকামীরা পড়বে বিপাকে। এবং এসবই এরদোগান ও ডানপন্থীরা করছে ব্যর্থ এই অভ্যুত্থানের পরবর্তী পরিণতি ও পদক্ষেপ হিসেবে।

তুরস্কে সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ও চর্চিত ধর্মনিরপেক্ষতার মূলনীতি যে এরদোগান ও তার ডানপন্থী গংদের হাতে এবার চুড়ান্তভাবে মুখ থুবড়ে পড়বে, তা অনেকটাই নিশ্চিত এবং সবচেয়ে দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এসবই হবে গণতন্ত্রের চাদরে। তবে তুরস্কের এই পরিণতির জন্য শুধুমাত্র ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো নয়, এর পেছনে মূল কারিগর হলো, তুরস্কের সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমান জনগণ, যারা ১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ নীতির সাথে তালমিলিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ মনন গড়ে তুলতে পারেনি আর এই চক্রে তুরস্কের সেক্যুলার শাসক-প্রশাসক শ্রেণী তাদের দায় এড়াতে পারেন না, কারন তারা রাষ্ট্র কাঠামোর সাথে সাথে সামাজিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছেন।

১৫-জুলাইয়ের এই ব্যর্থ অভ্যুত্থানকে এরদোগান ও তার ডানপন্থী সহচররা তথা ইসলামিস্টরা ধর্মনিরপেক্ষতার মূলনীতিকে কৌশলগতভাবে একপাশে সরিয়ে রেখে ইসলামি ভাবধারা পুনঃপ্রবর্তনের কাজে ব্যবহার করবে। রাষ্ট্রকাঠামোতে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চার জন্য তুরস্ক ছিল মুসলিম বিশ্বে অগ্রগামী ও পথিকৃৎ। প্রায় সব মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট রাষ্ট্র রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে ইসলামিস্টদের আগ্রাসনের শিকার, তুরস্ক এই ব্যর্থ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে দীর্ঘমেয়াদে এই আগ্রাসনের শিকারে পরিণত হলো। আর্থিকভাবে শক্তিশালী ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে প্রভাবশালী তুরস্ক ইসলামি জঙ্গিদের স্পন্সর ও বেনেফিসিয়ারি ইসলামিস্ট এরদোগান তথা একেপি’র হাতে পড়ার পরিণতিতে বৈশ্বিকভাবে জঙ্গিবাদের প্রসার ঘটবে, তা সহজেই অনুধাবন করা যায়।

Comments

Popular posts from this blog

মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতনে পাকিস্তানি মানস

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে চীনের ভূমিকা ও ভাসানীর দায়

অপারেশন সার্চলাইটঃ একটি পরিকল্পিত গণহত্যার সূচনা