যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা ও পুর্নবাসন করেছিল জিয়াউর রহমান

বাংলাদেশে একটি বহুল প্রচলিত মিথ হলো, যুদ্ধাপরাধীদের বঙ্গবন্ধু ক্ষমা করেছিল। এটি একটি ডাহা মিথ্যে কথা বরং আসল সত্য হলো, জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখলের পর বিচারের পথ রুদ্ধ করে দালাল আইনের অধীন যুদ্ধাপরাধী তথা, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের মুক্তির পথ করে দিয়েছিল।


বঙ্গবন্ধু সবসময়ই যুদ্ধাপরাধী ও দালালদের বিচারের পক্ষে কথা বলেছেন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে প্রদত্ত ঘোষণায় স্পষ্ট করে বলেন- একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই।

বঙ্গবন্ধু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে আন্তরিক ও দৃঢ় অবস্থান গ্রহন করেছিলেন; তাঁর বিভিন্ন বক্তব্য, পদক্ষেপ ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়ে ট্রাইবুনালের যতটা সম্ভব দ্রুত কার্যক্রম পরিচালনা দেখলে তা সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায়।

এবিষয়ে বঙ্গবন্ধুর কয়েকটি বক্তব্য:
কেউ দালালদের জন্য সুপারিশ করলে তাকেও দালাল সাব্যস্ত করা হবে - বঙ্গবন্ধু। (দৈনিক পূর্বদেশ - ০১ এপ্রিল, ১৯৭২)
বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে বিবৃতি দেওয়া ও পাকিস্তান সরকারে যোগ দেওয়া আওয়ামী লীগের গণপরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের ২৩ জনকে বহিষ্কার করেন। (দৈনিক ইত্তেফাক - ১০ এপ্রিল, ১৯৭২)

একাত্তরে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচারের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারী 'দালাল আইন (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশ ১৯৭২' সংসদে পাশ করে।
পরবর্তীতে একই বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি, ০১ জুন ও ২৯ আগস্ট তারিখে তিন দফা সংশোধনীর মাধ্যমে আইনটি চুড়ান্ত করা হয়।
এছাড়া, একই বছরের ১৩ জুন সরকারি চাকরিতে কর্মরতদের কেউ একাত্তরে পাকিস্তানের দালালি ও যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিল কি-না তা যাচাই করার জন্য একটি আদেশ জারি করা হয়।
এসব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ‘বঙ্গবন্ধু সরকার’ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্য শুরু করেছিল।

১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে দালাল আইনের আওতায় একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের সাথে জড়িত দালালদের  গ্রেপ্তার শুরু হয়, বিচার কার্যক্রম শুরু হয় এপ্রিলে। দ্রুত বিচারের জন্য সরকার সারা দেশে সর্বমোট ৭৩টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে।

এই বিচারকার্যে ৩৭,৪৪১ জনকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়।
বিপুল পরিমাণ মানুষ অভিযুক্ত হয়ে পড়ায় ও ব্যাক্তিগত শত্রুতার জের ধরে অভিযুক্তের তালিকায় অনেক নিরীহ মানুষের নাম থাকায় ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর ‘বঙ্গবন্ধু সরকার’ একটি সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা করে।

সাধারণ ক্ষমার সংশ্লিষ্ট নথিতে বলা হয়-
‘Those who were punished for or, accused of rape, murder, attempt to murder or, arson will not come under general amnesty.’
অর্থাৎ, একাত্তরে যুদ্ধের সময় যারা খুন-ধর্ষণ-লুটপাট ও এসবের চেষ্টার সাথে সম্পৃক্ত ছিল, এমন অভিযোগে অভিযুক্ত ও সাজাপ্রাপ্তরা এই সাধারণ ক্ষমার আওতায় আসবে না।

সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার নথির ৫ নং ধারায় আরো স্পষ্ট করে বলা হয়-

যারা নিচে বর্ণিত ধারাসমূহে শাস্তিযোগ্য অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত অথবা যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে অথবা যাদের বিরুদ্ধে নিম্নোক্ত ধারা মোতাবেক কোনটি অথবা সব ক’টি অভিযোগ থাকবে, তারা কোনোভাবেই সাধারণ ক্ষমার আওতায় আসবে না।

১২১ : বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানো অথবা চালানোর চেষ্টা।
১২১ (ক) : বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর ষড়যন্ত্র।
১২৮ (ক) : রাষ্ট্রদ্রোহিতা।
৩০২ : হত্যা।
৩০৪ : হত্যার চেষ্টা।
৩৬৩ : অপহরণ।
৩৬৪ : হত্যার উদ্দেশ্যে অপহরণ।
৩৬৫ : আটক রাখার উদ্দেশ্যে অপহরণ।
৩৬৮ : অপহৃত ব্যক্তিকে গুম ও আটক রাখা।
৩৭৬ : ধর্ষণ।
৩৯২ : দস্যুবৃত্তি।
৩৯৪ : দস্যুবৃত্তিকালে আঘাত।
৩৯৫ : ডাকাতি।
৩৯৬ : খুনসহ ডাকাতি।
৩৯৭ : হত্যা অথবা মারাত্মক আঘাতসহ দস্যুবৃত্তি অথবা ডাকাতি।
৪৩৫ : আগুন অথবা বিস্ফোরক দ্রব্যের সাহায্যে ক্ষতিসাধন।
৪৩৬ :  আগুন অথবা বিস্ফোরক দ্রব্য ব্যবহার করে বাড়িঘর ধ্বংস, কোন যানবাহনের ক্ষতিসাধন অথবা এসব কাজে উৎসাহ দান।

অর্থাৎ, একাত্তরে যুদ্ধাপরাধ তথা, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ও দন্ডপ্রাপ্ত কাউকে 'বঙ্গবন্ধু সরকার' ক্ষমা করেনি। এবং সাধারণ ক্ষমার আওতায় তারাই এসেছিল, যারা সুনির্দিষ্ট কোন যুদ্ধাপরাধ করেনি।

এই সাধারণ ক্ষমার মাধ্যমে যাদের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধাপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই’ এমন ২৬,৪৪১ জনকে ক্ষমা করা হয়।

তৎকালীন প্রকাশিত সরকারি গেজেটের বর্ণনা অনুযায়ী-

দালাল আইনে মোট অভিযুক্ত ব্যাক্তির সংখ্যা- ৩৭,৪৪১ জন।

সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আওতায় ক্ষমা পাওয়া ব্যাক্তির সংখ্যা- ২৬,৪৪১ জন (এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায়নি)।

সুনির্দিষ্ট যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ পাওয়া যায়, এমন অভিযুক্ত ব্যাক্তির সংখ্যা- ১১,০০০ জন (এদের মুক্তি দেয়া হয়নি)।

চুড়ান্ত অভিযুক্ত ১১,০০০ জনের মধ্যে ২,৮৪৮ জনের বিচারকার্য সম্পন্ন হয়।
এদের মধ্যে ২০৯৬ জন রায়ের অপেক্ষায় ছিল ও বাকি ৭‌৫২ জন অভিযুক্তের বিচারের রায় প্রদানকার্য সম্পন্ন হয়েছিল।
রায় প্রাপ্তদের মাঝে ১৯ জনকে মৃত্যুদন্ড, ৩০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয় ও ৪৮ জনের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয় এবং বাকিরা নানান মেয়াদে কারাদন্ডের সাজা পায়।

অর্থাৎ, দেখা যাচ্ছে, বঙ্গবন্ধু সরকার যুদ্ধাপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে, এমন ১১,০০০ জন অভিযুক্ত ও দন্ডপ্রাপ্ত কাউকেই ক্ষমা করেননি; এদের বিচারকার্য ও দন্ডপ্রদান ঠিকভাবেই চলছিল।
কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর এসবকিছুই পরিবর্তিত হয়ে যায়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকান্ডের পর বাংলাদেশে প্রো-পাকিস্তানি শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সময় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্য স্থগিত করা সহ তাদের পুর্নবাসন করা হয়।

১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর, প্রো-পাকিস্তানি ‘জিয়াউর রহমান অধীনস্ত সরকার’ পাপেট রাষ্ট্রপতি আবু সাদত মোহাম্মদ সায়েমের মাধ্যমে দালাল আইন বাতিলকরণ অধ্যাদেশ জারী করে।

ফলশ্রুতিতে, পরবর্তীতে পর্যাক্রমে ‘জিয়াউর রহমান অধীনস্ত সরকার’ দালাল আইনে অভিযুক্ত, বিচার চলছিল এমন ও দন্ডপ্রাপ্ত সব মিলিয়ে সর্বমোট ১১,০০০ জন যুদ্ধাপরাধীকে মুক্তি দেয়।

এখানে খেয়াল করার মত একটি  গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, 'দালাল আইন বাতিলকরণ অধ্যাদেশের' ২য় অনুচ্ছেদের ৩য় উপ-অনুচ্ছেদের 'ক'-ধারায় বলা হচ্ছে-
'যারা দালাল আইনে ইতোমধ্যে দন্ডিত হয়েছে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে আপিল করেছে, তাদের ক্ষেত্রে এই বাতিল অধ্যাদেশ প্রযোজ্য হবে না।'

অর্থাৎ, 'দালাল আইনে' সাজাপ্রাপ্ত ৭৫২ জনের জন্য 'দালাল আইন বাতিলকরণ অধ্যাদেশ' প্রযোজ্য ছিল না।
কিন্তু তারপরও এই দন্ডপ্রাপ্তরা কি করে সাজাভোগ না করে মুক্তি পেয়েছিল আর তাদের মুক্তি দিয়েছিল ‘জিয়াউর রহমান অধীনস্ত সরকার’।

এভাবেই, দালাল আইনে অভিযুক্ত ও দন্ডপ্রাপ্ত সকলকেই ‘জিয়াউর রহমান অধীনস্ত সরকার’ মুক্তি দিয়ে দেয়।

এর ফলে, দেশ স্বাধীন হবার পর 'বঙ্গবন্ধু সরকারের' উদ্যোগে শুরু হওয়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচার 'প্রো-পাকিস্তানী সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের' বিশ্বাসঘাতকতায় বন্ধ হয়ে যায়।

পরবর্তীতে দীর্ঘ তিনদশক পর বঙ্গবন্ধুর কন্যা ও বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার' উদ্যোগে ২০০৯ সালে পুনরায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়, যা বর্তমানেও চলমান।

সুতরাং এটি স্পষ্ট, বঙ্গবন্ধু যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করেননি, যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা ও পুর্নবাসন করেছিল জিয়াউর রহমান।

Comments

Popular posts from this blog

মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতনে পাকিস্তানি মানস

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে চীনের ভূমিকা ও ভাসানীর দায়

অপারেশন সার্চলাইটঃ একটি পরিকল্পিত গণহত্যার সূচনা