অবিশ্বাসীদের সংগঠিত হয়ে কাজ করার একটি প্রস্তাবনা

রিচার্ড ডকিন্স একবার বলেছিলেন-

অবিশ্বাসীদের সংগঠিত করার কাজটি বেশ কঠিন, কারন অবিশ্বাসীরা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে ভালোবাসে এবং কর্তৃত্ব পছন্দ করে না। তাই, অবিশ্বাসীদের একত্রিত করার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে যারা সংগঠিত হতে চাচ্ছে, তাদের একত্রিত করা যেতে পারে; যা পরবর্তীতে অন্য অবিশ্বাসীদেরও সংগঠিত হতে উৎসাহিত করবে। তবে, বাস্তবতা হলো, অবিশ্বাসীরা সংগঠিত না হলেও, অবিশ্বাসের সংগ্রাম থেমে থাকবে না; কারন অবিশ্বাসীরা সচেতন, অধিকাংশই নিজ নিজ অবস্থানে থেকে তাদের যুক্তিগুলোর পক্ষে নিয়মিত লেখালেখি-বির্তক করে যান
তবে, বর্তমান অস্থির সময়ের প্রেক্ষিতে অবিশ্বাসীদের উচিত নিজেদের সংগঠিত করার চেষ্টা করা; কারন, অবিশ্বাসী বা মুক্তচিন্তক মানে একা থাকা নয়।


ধাপ-এক
অবিশ্বাসীরা একসাথে কাজ করতে সম্মত হয়, এমন একটি উদার প্লাটফর্ম নির্মাণ:

যদি আপনার পোষা বেড়াল থাকে, তবে আপনি জানেন বেড়াল নিজের ইচ্ছেমত চলাফেরা করে, নিজের পছন্দমত জায়গায় যায়। আপনি না চাইলেও বেড়াল যেখানে যেতে চায়, সেখানেই যাবে সে তার মনমত অভিযানে বিরতি তখনই দেবে যদি সেই জায়গাটিতে পৌঁছুনোর সার্মথ্য তার না থাকে।
বেড়ালকে যদি আপনি আপনার মনমত চালাতে চান, তবে সে যা চায়, তা দিয়ে তাকে লোভ দেখাতে হবে। অর্থাৎ আপনাকে একটি জায়গা তৈরী করতে হবে, যা সে পছন্দ করে; শুধুমাত্র তখনই সে আপনার মনমত ওই জায়গায় যাবে। কিন্তু তা না করে যদি আপনি জোর করেন, তবে আপনি আবিষ্কার করবেন বেড়াল ও ইংরেজী যৌগিক বাক্যের পার্থক্য; যৌগিক বাক্যে খন্ডবাক্যের(Clause) পরে বিরতি(Pause) থাকে, ঠিক তেমনি বেড়ালের থাবার(Paws) পরে থাকে ধারালো নখ(Claws)

ঠিক তেমনি, আমরা অবিশ্বাসীরা হলাম বেড়ালের মত স্বাধীনচেতা। আমরা আত্মসম্মানবোধ, ব্যাক্তিগত দায়িত্ববোধ এবং নিজস্বতার প্রতি গুরুত্ব দিই, ফলে আমরা কারো নেতৃত্ব মেনে নিতে সহজবোধ করি না এবং অধিকাংশ সময়ই আমাদের বিবেচনা ও বিশ্লেষণকে র্সবোচ্চ প্রাধান্য দিই।
আমরা নিজেদের বিবেচনাবোধের প্রতি খুব যত্মশীল, ফলে সাংগঠনিক বিষয়ে ব্যাক্তিগত মতামত প্রভাব বিস্তারের প্রয়াস থাকে; এর ফলাফল হয় প্রায়ই হতাশাজনক। ফলশ্রুতিতে, সংগঠনে যুক্ত হবার ক্ষেত্রে আমাদের অনীহা অনুভব করি।

তাই, অবিশ্বাসীদের সংগঠিত করার সময় আমাদের বেড়ালের কথা মনে রাখতে হবে; সংগঠনের উদ্দেশ্য, কর্মপন্থা ও কর্মপরিবেশ এমনভাবে সৃষ্টি করতে হবে, যাতে সহ-অবিশ্বাসীরা এতে সংযুক্ত হতে ও কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। আমাদের অবশ্যই তাদের মতামত ও বিবেচনাবোধ এবং আকাঙ্খার প্রতি যত্মশীল হতে হবে।

ধাপ-দুই
পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে লক্ষ্য ও ক্ষেত্র বিনির্মানের প্রচেষ্টা:

অবিশ্বাসীদের সংগঠিত হবার প্রয়াসের সাথে বিশ্বাসীদের নিজেদের সংগঠিত করার প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় অমিল হলো, আমাদের লক্ষ্য ও কাজের ক্ষেত্র বিশ্বাসীদের মত নির্দিষ্ট ও সীমিত নয়, বরং বিস্তৃত এবং অবিশ্বাসীরা অন্যের মতামতকে যাচাই করা ছাড়া গ্রহণ করে না এবং বিজ্ঞান, বাস্তবতা ও যুক্তির উপর আস্থাশীল; এই বিষয়গুলো বিশ্বাসীদের মধ্যে পুরোপুরি অনুপস্থিত।
উদাহরন হিসেবে বলা যায়, অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে, ধর্মের সমালোচনার বিরুদ্ধে ও ধর্মীয় ইস্যুতে মুসলমান সকলেই দল-মত নির্বিশেষে একতাবদ্ধ হয়; এর প্রমাণ হিসেবে অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে মুসলমানদের সমাবেত হওয়া, ফাঁসি চাওয়া, অবিশ্বাসী-লেখকদের খুন হওয়াকে নৈতিক সমর্থন জানানো বা অতিসাম্প্রতিক সময়ে আইএসের বিরুদ্ধে রাশিয়া পরিচালিত অভিযানের বিরোধিতা করার ঘটনাগুলো উল্লেখ করা যায়; এই সব ঘটনাগুলোতে একটি বিষয় খেয়াল করার মত, মুসলমানরা অধিকাংশই আসলে অবিশ্বাসীদের বক্তব্য জানে না, তারা শুধুমাত্র মোল্লাদের কথার উপর ভিত্তি করে একত্রিত হয়।

আমরা অবিশ্বাসীরা একটি বিষয়ের উপর জোর দিতে ভুল করি, আমাদের মধ্যে পারস্পরিক অভিন্ন লক্ষ্য ও কর্মক্ষেত্র অপ্রতুল নয়। এই অভিন্ন লক্ষ্য ও কর্মক্ষেত্রগুলোতে আমরা সংগঠিত হতে পারি; মনে রাখা উচিত, অভিন্ন উদ্দেশ্যে একত্রিত হওয়া মানে নিজস্বতা বিলীন হওয়া নয়, বরং বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনে সংগঠিত হওয়া বর্তমান সময়ের জন্য খুব জরুরি।
বর্তমানে বাংলাদেশ সহ সারা বিশ্বে অবিশ্বাসী, প্রগতিশীল ও মুক্তচিন্তকদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসীদের হিংস্র কর্মকান্ডের বিপরীতে অবিশ্বাসীদের সংগঠিত হওয়াটি সময়ের দাবিমাত্র।
তাই, অবিশ্বাসীদের সংগঠিত করার প্রচেষ্টায় আমাদের প্রাথমিক কাজ হলো, অভিন্ন লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ করে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে একত্রিত হওয়া।

ধাপ-তিন
নতুনদের পরিচর্যা করা ও সামাজিক দায়িত্ব পালনে সংগঠিত হয়ে কাজ করা:

নতুনদের পরিচর্যা করা:

বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায়, গত দশ থেকে পনেরো বছর ধরে প্রচলিত ধর্মে আস্থা হারিয়েছেন বা ধর্ম প্রচলিত আনুষ্ঠানিকতা পালন ছেড়ে দিয়েছেন, এমন মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। এর মানে এই নয় যে, এই মানুষদের সকলে অবিশ্বাসী হতে পেরেছেন; এদের অনেকেই চিরায়িত সত্য অনুসন্ধান করছেন, অনেকে সত্য অনুসন্ধান করতে যেয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনার অভাবে দিকভ্রান্ত হয়েছেন, অনেকেই আবার উত্তর খুঁজতে ব্যর্থ হয়ে বা সাহসের অভাবে প্রচলিত ধর্মের বাইরে যেয়ে নিজস্ব বোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে আধ্যাত্মিকতার দিকে ঝুঁকেছেন।

ধর্মত্যাগের এই ঘটনাগুলো থেকে দু’টো বিষয় উঠে এসেছে-প্রথমতঃ ধর্মতত্ত্বের আলোচনার সীমাবদ্ধতাগুলো ঝাপসা হয়ে আসছে এবং দিন দিন ধর্মের সাথে ধর্মতত্ত্বের আলোচনা কঠিন হয়ে উঠেছে; কারন, এই ধরণের দলছুট বিশ্বাসীরা নিজেদের মত করে ধর্মের মতবাদগুলোকে বিশ্লেষণ করছে; ফলে, অবিশ্বাসীরা ধর্ম বিষয়ক বিতর্কে ও ক্ষোভ প্রকাশে কৌশল পরিবর্তন করছে।
দ্বিতীয়তঃ প্রচলিত ধর্মে আস্থা হারানো ও ধর্মে প্রচলিত আনুষ্ঠানিকতা পালন না করা মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বাভাবিক কারনে, প্রচলিতমতের বিশ্বাসীর সংখ্যা কমছে; যা অবিশ্বাসীদের মাঝে একটি স্বস্তির জায়গা সৃষ্টি করছে।

এখানে একটি বিষয় লক্ষনীয়, ধর্মত্যাগের পূর্বে এই ধর্মত্যাগীরা একটি ধর্মীয়সমাজের অংশ ছিল; যা তারা তাদের নতুন ধারণার জন্য হারিয়েছে। ফলে, তারা আজ দলছুট, কোন সমমনা, উন্মুক্ত ও উদার  মানসিকতার মানুষদের সাথে গোত্রভুক্ত হবার জন্য মুখিয়ে আছে।

অবিশ্বাসীরা এই বিষয়গুলো নিয়ে সংগঠিত হয়ে কাজ করতে পারেন; চিরায়িত সত্য অনুসন্ধানরতদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে পারেন, চিরায়িত সত্য উদঘাটনে সহায়তা করতে পারেন।

সামাজিক দায়িত্ব পালনে সংগঠিত হয়ে কাজ করা:

অবিশ্বাসীদের সংগঠিত করার কাজে অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে, পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে বৃহত্তর স্বার্থে এক হয়ে কাজ করার ক্ষেত্র ও পরিবেশ সৃষ্টি করাটিই হলো আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য; ঠিক সেই বেড়ালের উদাহরণের মত, আমরা নিজেদের সংগঠিত করার কাজে পরস্পরের উপর নিজেদের মতামত চাপিয়ে দেবো না, বরং এমন একটি স্বাচ্ছন্দ্যময় কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যেখানে অবিশ্বাসীরা তাদের নিজেদের মতামতগুলো প্রকাশ করতে পারবে, কেউ কারো উপর কর্তৃত্ব খাটাবে না এবং সামষ্ঠিকভাবে লক্ষ্য বাস্তবায়নে এগিয়ে যেতে পারবে।
আর এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে সূচনার পন্থা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে সামাজিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রগুলোতে সংগঠিত হওয়া। আমরা অবিশ্বাসীরা সামাজিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রগুলোতে একত্রিত হয়ে সংগঠিত হতে পারি; যেমন, আমরা আমাদের এলাকায় বা শহরে জনকল্যানকর মানবিক কাজগুলোতে অংশগ্রহন করতে পারি বা নিজেরাই এই ধরণের কাজের উদ্যোগ নিতে পারি।
এরফলে, বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হয়ে থাকা মুক্তমনের মানুষগুলোকে একটি প্লাটফর্মে আনা যাবে; যেখানে পরস্পরের প্রতি সদস্যদের শ্রদ্ধাবোধ ও দায়িত্ববোধ গড়ে উঠবে এবং একত্রিত হয়ে লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে যাবার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ প্রত্যয় থাকবে।

ধাপ-চার:
সংগঠিত হবার উদ্দেশ্যে একটি প্রস্তাবনা:

উপরের লেখা পড়ে হয়তো আপনি একজন অবিশ্বাসী হিসেবে অন্যান্য অবিশ্বাসীদের সাথে একত্রিত হয়ে সংগঠিত হতে চাইবেন, সেক্ষেত্রে আপনি চাইলে Atheist BangladeshMukto-Mona, বিজ্ঞান-যুক্তিবাদী-প্রগতিশীল-মুক্তমত প্রকাশের অনলাইন-অফলাইন সংগঠনগুলোকে বেছে নিতে পারেন; তবে এর মানে এই নয় যে, এই সংগঠনগুলোর সাথেই আপনাকে যুক্ত হতে হবে; আপনি চাইলে নিজেই উদ্যোগ নিতে পারেন আপনার পরিচিত অবিশ্বাসদের সংগঠিত করার বা স্থানীয় ও আর্ন্তজাতিক পরিমন্ডলে থাকা অবিশ্বাসীদের সংগঠনের সাথে যুক্ত হতে পারেন।
সংগঠিত হবার প্রচেষ্টায় অবশ্যই মাথা রাখতে হবে, এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলার, যেখানে অবিশ্বাসীরা নিজেদের আত্মমর্যাদা বজায় রাখতে পারবেন, নিজেদের মতামত সাবলীলভাবে প্রকাশ করতে পারবেন, যেখানে সদস্যরা পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও দায়িত্ববোধ বজায় রেখে সংগঠিত হয়ে লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে যাবার পথে কাজ করতে পারবে

তাহলে, বেরিয়ে পড়ুন, জোর আওয়াজ তুলুন, আমরা ইশ্বরহীন হয়েও চমৎকার আছি, এই সমাজকে আরো উন্নত করার জন্য কাজ করছি। যারা আমাদের বিপদগামী ভাবে, যারা ভাবে আমরা সামজের জন্য ক্ষতিকর; তারা দেখুক আমরা সুকুমার বৃত্তির চর্চা করি, মানবিকতার চর্চা করি। যেখানে বিশ্বাসীরা তাদের বিশ্বাসের জন্য মানুষ হত্যা করে, উচ্ছেদ করে, বর্বর আচরণ করে; সেখানে অবিশ্বাসীরা মানুষের জন্য কাজ করছে, বিজ্ঞানের চর্চা করছে, সভ্যতাকে এগিয়ে নেয়ার কাজ করছে। যুগে যুগে এমনটিই হয়েছে, প্রত্যোক যুগের মুক্তমনের মানুষরাই জগতকে এগিয়ে নেয়ার জন্য কাজ করেছে; মানবসভ্যতার উন্নতির পথে যা কিছু প্রাপ্তি ও ভালো, তা মুক্ত মনের মানুষদেরই কাজের ফসল।
আসুন, সংগঠিত হোন, বিজ্ঞান ও যুক্তি চর্চার আলোকে মানবিক পৃথিবীর জন্য কাজ করুন।

অবিশ্বাসের জয় হোক...


ছবিসূত্র (লিংক)

Comments

Popular posts from this blog

মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতনে পাকিস্তানি মানস

কল্পিত বিহারি গণহত্যাঃ একাত্তরের পরাজিত শক্তির অপকৌশল

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে চীনের ভূমিকা ও ভাসানীর দায়