মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র, দেশের তৃতীয় এবং ক্যাম্পাস আয়তনের দিক থেকে সর্ববৃহৎ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
মুক্তিযুদ্ধের মাত্র ৫ বছর আগে ১৯৬৬ সালে যাত্রা শুরু করলেও স্বাধীনতার সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ ও দেশের বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবদান পর্বততুল্য।
৬৯'এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১'এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০'এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ১৩'এর গণজাগরণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে।


১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের  ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন, প্রায় দুইশ'জন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়ের বারোজন ছাত্র, একজন শিক্ষক ও তিন জন কর্মকর্তা-কর্মচারী শহীদ হন।
মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৌশল দপ্তরের কর্মচারী শহীদ মোহাম্মদ হোসেনকে বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধে আত্মাহুতিদানকারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বীর সন্তানদের স্মৃতিকে ধরে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশমুখে নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ 'স্মরণ'।

মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ঃ

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ০৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পরের দিন ০৮ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আজিজুর রহমান মল্লিকের সভাপতিত্বে বাণিজ্য বিভাগের শ্রেণীকক্ষে (বর্তমানে চবি স্কুল) অনুষ্ঠিত এক সভায় ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে গণিত বিভাগের অধ্যাপক মো. ফজলী হোসেন ও বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মাহবুব তালুকদারকে আহবায়ক করে 'চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ' গঠন করা হয়।
'চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ' পাকিস্তানিদের সম্ভাব্য আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ইনামুল হকের নেতৃত্বে ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ প্রদান কর্মসূচী গ্রহণ করে এবং পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ শামসুল হক, এখলাস উদ্দিন আহমদ ও মিছবাহ উদ্দিন আহমেদের উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ে মলোটভ ককটেল প্রস্তুতের পরিকল্পনা করে।

অন্যদিকে রাজনৈতিক ও সংগঠিত হবার প্রস্তুতি চলতে থাকে।
০৮ মার্চ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদের (চাকসু) জিএস আবদুর রব ভারতে সামরিক ট্রেনিংয়ের জন্য পৌঁছে দেয়ার কাজ শুরু করেন।
১০ মার্চ চাকসু ভিপি মোহাম্মদ ইবরাহিম ও জিএস আবদুর রব সশস্ত্র বাহিনীর বাঙালি সদস্যদের তাদের অস্ত্র জমা না দেয়ার আহবান জানিয়ে এক বিবৃতি প্রদান করেন।
১৭ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক শামসুল আলমের বাসায় আওয়ামী লীগ নেতা আতাউর রহমান খান কায়সার, আবু জাফর, ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন হারুন আহমেদ চৌধুরী, ক্যাপ্টেন অলি আহমদ ও ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান চৌধুরী পাকিস্তানি বাহিনীর সম্ভাব্য আক্রমণে করণীয় বিষয়ে এক বৈঠক বসেন।
২৪ মার্চ বিশ্ববিদ্যোলয়ের প্রাক্তন ছাত্র সমিতির আয়োজনে কেন্দ্রীয় মাঠে স্বাধীনতা সংগ্রামের সমর্থনে গণসঙ্গীতের আয়োজন করা হয়। একইদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মল্লিকের নেতৃত্বে একটি মিছিল মুসলিম ইনস্টিটিউট থেকে লালদীঘি মাঠে এসে শেষ হয়।

অবশেষে আসে সেই কালো রাত- ২৫ মার্চ।
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানিদের পরিচালিত জেনোসাইড 'অপারেশান সার্চলাইটের' প্রেক্ষিতে  মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার পর ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে ভিসি ড. মল্লিক, অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান, ড. আনিসুজ্জামান ও রেজিস্ট্রার খলিলুর রহমান, চাকসু ভিপি-জিএসের উপস্থিতিতে সংগ্রাম পরিষদ সিদ্ধান্ত নেয় যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী, ইপিআর বাঙালি সেনা ও গ্রামবাসীরা মিলে ক্যাম্পাস ঘেরাও করে রাখা হবে যেন পাকিস্তানি সৈন্যরা বিশ্ববিদ্যালয়কে দখলে নিতে না পারে।
২৬ মার্চ সকালে পাকিস্তানি সেনারা ক্যাম্পাস দখল করতে আসে।
পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমন ঠেকাতে সংগ্রাম পরিষদ আলাওল হলকে ঘাঁটি করে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যুহ তৈরি করে।
সুপ্রশিক্ষিত পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে এই শক্ত প্রতিরোধ চলে টানা দশদিন।
০৫ এপ্রিল পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনাদের গোলন্দাজদের তুমুল আক্রমনে প্রায় নিরস্ত্র সংগ্রাম পরিষদ পিছু হটতে বাধ্য হয়।

এরপর টানা নয় মাস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘাঁটি গেড়েছিল পাকিস্তানিরা, পুরো ক্যাম্পাসকে বানিয়েছিল জমপুরী, ক্যাম্পাসে কনসেনট্রেশান ক্যাম্প স্থাপন করেছিল পাকিস্তানিরা।

পরবর্তীতে যুদ্ধের একেবারে শেষদিকে ১৪ ডিসেম্বর জাফর ইমামের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অভিযান শুরু করে।
১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় আত্মসমর্পণের নয়দিন পর ২৫ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পাকিস্তানি অধীনতা মুক্ত হয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদরাঃ

মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ষোল শহীদ হলেন-

০১. বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের চেইনম্যান বীরপ্রতীক মোহাম্মদ হোসেন।
০২. দর্শন বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক অবনী মোহন দত্ত।
০৩. চাকসুর সাধারণ সম্পাদক ইতিহাস বিভাগের ছাত্র আবদুর রব।
০৪. উপ-সহকারী প্রকৌশলী প্রভাস কুমার বড়ুয়া।
০৫-০৭. বাংলা বিভাগের ছাত্র মনিরুল ইসলাম খোকা, মোহাম্মদ হোসেন ও মোস্তফা কামাল।
০৮-০৯. অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র নাজিম উদ্দিন খান ও আবদুল মান্নান।
১০. ইতিহাস বিভাগের ছাত্র ফরহাদ উদ-দৌলা।
১১. বাণিজ্য অনুষদের ছাত্র খন্দকার এহসানুল হক আনসারি।
১২. ইংরেজি বিভাগের ছাত্র আশুতোষ চক্রবর্তী।
১৩. সমাজতত্ত্ব বিভাগের ছাত্র ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদ।
১৪. রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র আবুল মনসুর।
১৫. গণিত বিভাগের ছাত্র ভুবন। (মুক্তিযুদ্ধের মহানায়কেরা-নভেম্বর ১৮, ২০১৬-দৈনিক পূর্বকোন সূত্রে প্রাপ্ত)
১৬. আলাওল হলের প্রহরী ছৈয়দ আহমদ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদের ছাত্র শহীদ খন্দকার এহসানুল হক আনসারি শহীদ জায়া মুশতারী শফির ভাই।
৭ এপ্রিল রাতে পাকিস্তান সেনা ও দালালরা মুশতারী শফির স্বামী ডা: মোহাম্মদ শফি ও ভাই খন্দকার এহসানুল হক আনসারিকে ধরে নিয়ে যায়, তাঁরা আর ফিরে আসেননি।
শহীদ খন্দকার এহসানুল হক আনসারি তখন এম.কমের ছাত্র ছিলেন।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে অস্ত্রাগার লুটের অভিযানে তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন।

তৎকালীন চাকসুর সাধারণ সম্পাদক ইতিহাস বিভাগের ছাত্র আবদুর রব।
১৩ এপ্রিল ভারতগামী একটি প্রশিক্ষণার্থী দলকে জিপে করে রামগড় পৌঁছে দেবার পথে বর্তমান চুয়েট এলাকায় পাকিস্তান সেনাদের হাতে ধরা পড়েন তিনি।
বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়।

ইতিহাস বিভাগের ছাত্র শহীদ ফরহাদ উদ-দৌলা এম.এ পড়ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধে তিনি কক্সবাজারে যুদ্ধ করেছেন।
০৫ মে পাকিস্তান সেনা ও দালালদের সাথে যুদ্ধে তিনি আহত হয়ে মসজিদে আশ্রয় নেন।
সেখান থেকে তাঁকে টেনে হেঁচড়ে বের করে বাঁকখালী নদীর তীরে গুলি করে হত্যা করে নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেয়া হয়।

মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগাযোগ ও তাঁদের সহায়তা করার অভিযোগে ০৮ মে দর্শন বিভাগের শিক্ষক অবনী মোহন দত্তকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, আর ফেরেননি তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের চেইনম্যান বীরপ্রতীক মোহাম্মদ হোসেন ছিলেন নৌকমান্ডো।
১৬ মে নিজ শরীরে লিমপেট মাইন বেঁধে কর্ণফুলী নদীতে পাকিস্তানি জাহাজ ধ্বংস করার অভিযানের সময় শহীদ হন।

রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র শহীদ আবুল মনসুরকে মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য বের করার জন্য ২৩ নম্বেভর আলবদর বাহিনী তাঁর বাসা থেকে তুলে নিয়ে যেয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।

মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদের সৃত্মি সংরক্ষণের উদ্যোগঃ

মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদের সৃত্মি সংরক্ষণে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দুটি সৃত্মিস্তম্ভ ও একটি ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে।
১৯৮৫ সালে মুর্তজা বশীরের প্রচেষ্টায় স্থাপন করা হয় স্বাধীনতা ভাস্কর্য।
একই বছর শিল্পী রশিদ চৌধুরীর নকশায় নির্মিত হয়েছে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভ।
২০০৯ সালে স্থাপিত হয় শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ 'স্মরণ', এর স্থপতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ সাইফুল কবীর।
মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের চেইনম্যান বীরপ্রতীক মোহাম্মদ হোসেনের গ্রামের বাড়ি হাটহাজারী সফিনগর পশ্চিম ধলই গ্রামে 'স্মৃতি ভবন' তৈরি করা হয়েছে।
ক্যাম্পাসে চাকসুর সাধারণ সম্পাদক ইতিহাস বিভাগের ছাত্র শহীদ আবদুর রব স্মরণে একটি ছাত্র হলের নামকরণ করা হয়েছে।
শহীদ বীরপ্রতীক মোহাম্মদ হোসেন, শহীদ আবদুর রব, শহীদ ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদ, শহীদ ফরহাদ উদ-দৌলা, শহীদ নাজিম উদ্দিন খান, শহীদ প্রভাস কুমার বড়ুয়া এবং শহীদ ছৈয়দ আহমদের স্মরণে ক্যাম্পাসে সড়কের নামকরণ করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে চালু করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কর্নার।
১৯৯৩ সালে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভের বিপরীত পাশে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার স্থাপন করা হয়, এর স্থপতি অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল্লাহ খালেদ।

অতল শ্রদ্ধা, আকন্ঠ কৃতজ্ঞতা ও হৃদয়ভরা ভালোবাসায় মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করছি।

Comments

Popular posts from this blog

মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতনে পাকিস্তানি মানস

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে চীনের ভূমিকা ও ভাসানীর দায়

অপারেশন সার্চলাইটঃ একটি পরিকল্পিত গণহত্যার সূচনা