বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডঃ মাশুল দিচ্ছে বাংলাদেশ

১৫ আগস্ট, ১৯৭৫; সেদিন ছিল শুক্রবার। বাঙালির ইতিহাসের কালোতম একটি দিন। বিশ্বাসঘাতকতার বলি হলেন বাঙালির একমাত্র জাতি-রাষ্ট্রের জনক ও তাঁর পরিবার। রক্তাক্ত হয়েছিল ধানমন্ডি ৩২; ৫৫ বছর বয়সী বঙ্গবন্ধুর নিথর দেহ সিঁড়িতে পড়েছিল। বাঙালিকে ভালোবাসা-ই হয়েছিল তাঁর কাল।




বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড ছিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের প্রতিশোধ, শীতলযুদ্ধের একটি পরিণতি ও দেশীয় লোভী বিশ্বাসঘাতক-দালালদের ঘৃণ্যকর্ম। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের প্রথমভাগে বঙ্গবন্ধু সরকারের দুর্নাম ছড়ানো হয়েছিল। হলুদ সাংবাদিক, দুর্নীতিবাজ আমলা, অসৎ রাজনীতিক, উচ্চবিলাসী সেনা, কালোবাজারি ব্যবসায়ীরা এই প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর কাজ সুনিপুণভাবে সম্পন্ন করে; এই শয়তানের দলের উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের আখের গোছানো। ধীরে ধীরে ষড়যন্ত্রীরা এগিয়ে যায় তাদের শেষ আঘাত করতে- বাংলাদেশকে আধুনিকায়ন করার পথে বাকশাল ব্যবস্থা বাস্তবায়নের প্রারম্ভিক মুহুর্তে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলো।

রেডিওতে ভেসে আসছিল খুনি ডালিম, মোশতাকের কন্ঠস্বর; মুজিব মৃত, বাংলাদেশ এখন ইসলামিক রিপাবলিক। বাঙালির নিকৃষ্ট এই সন্তানরা মেতে উঠেছিল উৎসবে। পুরান ঢাকা, মোহাম্মদপুর, মিরপুরে 'পাকিস্তান জিন্দাবাদ' ধ্বনি প্রায় সাড়ে তিনবছর পর আবার শোনা যায়, পাকিস্তানপন্থীরা প্রকাশ্যে আবার বেরিয়ে আসে।

কেন স্বপরিবারে নৃশংসভাবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল? এর উত্তরটি জটিল কিছু নয়। বঙ্গবন্ধু বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা। তাঁকে শেষ করতে হলে সমূলে করতে হবে, এই কথাটুকু বুঝতো কাপুরুষ খুনিরা। শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে খুনিরা এমনভাবে হামলা চালিয়েছিল যেন, সেটি কারো বাসস্থান নয়, ছিল একটি মহাকুরুক্ষেত্র। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর খুনি আর ষড়যন্ত্রীরা এতটাই ভয়ে ছিল যে, খন্দকার মোশতাকের নিরাপত্তায় নিশ্চিত করতে বঙ্গভবনে ট্যাংক মোতায়েন করা হয়।

কিন্তু না, খুনিদের বিরুদ্ধে আম বাঙালি এগিয়ে আসেনি। ৩০ লক্ষাধিক শহিদ ও ৫ লক্ষাধিক নির্যাতিত নারীর উপর দাঁড়ানো স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষের বিবেক তখন মৃত। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড ও তার পরবর্তী ঘটনাবলী থেকে এটি সুস্পষ্ট হয়ে যায়- বাঙালি পঁচে গেছে। ধরে নেয়া হয়েছিল, রক্ষীবাহিনী প্রতিরোধ সংগ্রাম শুরু করবে কিন্তু তারা কিছু-ই করেনি। প্রায় সাত কোটি বাঙালি কিন্তু বঙ্গবন্ধুর প্রতিবাদে এগিয়ে এসেছিল মাত্র গুটিকয়েকজন। চট্টগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, পাবনা, কুমিল্লা, সুনামগঞ্জ, জামালপুর, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জে প্রতিরোধ সংগ্রাম শুরু করেন এঁরা। অনেকে ভারতে আশ্রয় নিয়ে সংগঠিত হয়ে প্রতিরোধ সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু জনগণের কাছ হতে তেমন কোন সমর্থন না পেয়ে এবং পরবর্তীতে ভারত সরকার থেকেও সহযোগিতা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই প্রতিরোধ সংগ্রাম বিলীন হয়ে যায়; শহিদ হন এঁদের অনেকেই, যাঁরা বেঁচে ছিলেন, তাঁরা সহ্য করেছেন কারাগারের নির্যাতন। সেসময়টি ছিল পাকিস্তানের প্রেত্মাতার কাছে পুনরায় আত্মসমর্পনের অন্ধকার সময়।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের প্রতিরোধ সংগ্রাম বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সেভাবে হয়নি বলে, ভারত ও রাশিয়া হতে প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, এছাড়া শীতল যুদ্ধের উত্তাল ওই সময়গুলোতে দ্বিতীয়বার বাংলাদেশের জন্য প্রত্যক্ষভাবে কিছু করা সেভাবে সম্ভবপর ছিল না।
একাত্তরে পরাজিত পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সৌদিআরবের জন্য সেদিন ছিল মহা আনন্দের। পরাজয়ের সাড়ে তিনবছরের মধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের ঘরে বিজয় তুলে নিয়েছিল। সেদিন হতে বাংলাদেশ আবার পেছনে হাঁটা শুরু করে; স্বাধীন-সার্বভৌম হয়েও বাংলাদেশ পরিণত হয় পাকিস্তান ও তার মিত্রদের ছায়ারাষ্ট্রে।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয় সেদিন সন্ধ্যায়। ষড়যন্ত্রী খন্দকার মোশতাক সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেয়, শপথ পাঠ করান বিচারপতি সৈয়দ এ.বি. মাহমুদ। সামরিক বাহিনীর তৎকালীন তিন প্রধান উপস্থিত ছিলেন সেখানে, অারো ছিল দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত সংসদ সদস্যরা। কি নিদারুন বিশ্বাসঘাতকতা! দেখে মনে হয়, বাঙালি ৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ করেছিল লুটপাটের মধ্য দিয়ে নিজের আখের গোছাতে, স্বাধীন-সার্বভৌমত্ব ও প্রগতির জন্য নয়।

বাংলাদেশ, বাঙালি আজো এই বিশ্বাসঘাতকতার মাশুল দিয়ে যাচ্ছে...

Comments

Popular posts from this blog

মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতনে পাকিস্তানি মানস

কল্পিত বিহারি গণহত্যাঃ একাত্তরের পরাজিত শক্তির অপকৌশল

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে চীনের ভূমিকা ও ভাসানীর দায়