মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতন কড়চা

বাঙালি জাতি নয় মাসের স্বল্প সময়ে স্বাধীনতা অর্জন করলেও, তার ত্যাগের পরিমাণ ভয়াবহ। পুরো বাঙালি জাতিকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল পাকিস্তানিরা। ত্রিশ লক্ষের অধিক বাঙালিকে হত্যা করেছিল, কম করে পাঁচ লক্ষ বাঙালি নারীকে ধর্ষণ করেছিল, পুরো দেশের অবকাঠামো ও এই জনপদের স্বাভাবিকত্ব ধ্বংস করে দিয়েছিল পাকিস্তানিরা।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিরা বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল। একাত্তরে কম করে হলেও পাঁচ লক্ষ বাঙালি নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছিল।
এই লেখায় পাকিস্তানিদের এই ভয়ংকর অপরাধ সংঘটন করার কারণ, অপরাধের প্রকৃতি ও ভিক্টিমের সংখ্যা নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে।
পাকিস্তানিদের বাঙালি নারী ধর্ষণের পেছনে তিনটি কারণ কাজ করেছিল-
১. ধর্মীয় কারণ;
২. বাঙালি জাতির প্রতি তীব্র ঘৃণা হতে এবং বাঙালি জাতিকে বিশুদ্ধ (!) করার জন্য;
৩. অপরাধ প্রবৃত্তির কারণে
বাঙালি মুসলমানকে হিন্দুয়ানি মুশরিকি আচার পালনকারী নিঁচু জাতের অবিশুদ্ধ মুসলমান ভাবতো পাকিস্তানিরা; ওরা বাঙালি জাতিকে বিশুদ্ধ করতে চেয়েছিল; তাই, ওরা ধর্ষণ করে বাঙালির গর্ভে পাকিস্তানি সন্তানের জন্ম দিতে চেয়েছিল।
পাকিস্তানিদের দৃষ্টিতে একাত্তরে ওরা বাংলাদেশে জিহাদ করছিল, তাই এ অঞ্চলের অধিকৃত অংশের অমুসলিমরা গণিমতের মাল, অমুসলিম নারীরা যৌনদাসী।
যুদ্ধের সময় গণিমতের মাল হিসেবে বন্দী হওয়া নারীদের সাথে তাদের অসম্মতিতে সঙ্গম মানে ধর্ষণ করা বৈধ।
তাই, অমুসলিম বাঙালি নারীদের ধর্ষণ করা বৈধ ছিল পাকিস্তানিদের কাছে।
এছাড়া, মুসলিম বাঙালিদেরও যেহেতু ওরা অবিশুদ্ধ মুসলমান তথা বিদাতি এবং মুরতাদি ভাবতো, তাই ওদের দৃষ্টিতে এসব বিদাতি ও মুরতাদি তথা মুসলমান বাঙালি নারীরাও গণিমতের মাল, এদের ধর্ষণ করা বৈধ।
ভয়াবহ এই মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের পিছনে যুক্তি হিসেবে পাকিস্তানিরা ও তাদের দালালরা ধর্মকে যুক্তি হিসেবে দেখিয়েছিল; অর্থাৎ, এই ভারতীয় উপমহাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলমানদের রাষ্ট্র তথা পাকিস্তান সমুন্নত রাখার জন্য লড়াই, তথা জিহাদ।
এই যুদ্ধের একপক্ষ পাকিস্তান নিজেদের ভাবতো মুজাহিদ (ধর্মের জন্য লড়াইকারী) আর প্রতিপক্ষ বাঙালি তাদের কাছে ছিল- বিদাতি, মুরতাদি, মুনাফেক ও মুশরিক।
মুক্তিযুদ্ধকে পাকিস্তান জিহাদ তথা ধর্মযুদ্ধ হিসেবে দেখতো, প্রমাণ হিসেবে পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় ১৯৭১ সালে প্রকাশিত নিচের কয়েকটি বিজ্ঞাপন উল্লেখ করা হলো-

পাকিস্তানি সৈন্যরা বাঙালি নারী নির্যাতনে দুটি পদ্ধতি অবলম্বন করতোঃ
১. উপস্থিত ধর্ষণ।
২. যৌনদাসী।

* উপস্থিত ধর্ষণ:
পাকিস্তান আর্মি, বিহারি, রাজাকার ও দালালরা অধিকৃত বাংলাদেশের শহর-গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে/এলাকায় আক্রমন করে খুন-লুটপাটের সাথে সেখানেই নারীদের ধর্ষণ করতো।
পাকিস্তানি ও দালালরা রাস্তা থেকে বা কোন জায়গা হতে বাঙালি নারীদের তুলে নিয়ে ধর্ষণ করতো।
নিখোঁজ-গ্রেফতারকৃত পরিবারের সদস্যদের সন্ধানে ও বিপদে পড়ে যারা পাকিস্তান আর্মি-বিহারী ও দালালদের কাছে সহযোগিতা চাওয়ার জন্য যেতো; তাদের অনেককে ধর্ষণ করা হতো।
ধর্ষণ শেষে নির্যাতিতদের কাউকে হত্যা করা হতো, কাউকে ছেড়ে দেয়া হতো।
একটি বিষয় এখানে উল্লেখ্য, উপস্থিত ধর্ষণের শিকার যারা হয়েছিলেন, তাদের যৌনদাসী করা হয়নি; মানে দীর্ঘদিন ধরে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়নি। একাত্তরে মোট নির্যাতিত নারীর শতকরা ৭০ ভাগ উপস্থিত ধর্ষণের শিকার।
ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির হিসেবে, উপস্থিত ধর্ষণের শিকার নারীর সংখ্যা প্রায় ৩,২৭,৬০০ জন। এদের প্রায় ত্রিশ ভাগ অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন।
ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি আরো জানাচ্ছে, অধিকৃত বাংলাদেশে প্রতিদিন উপস্থিত ধর্ষণে গড়ে ৩,০০০ পাকিস্তানি সৈন্য অংশগ্রহণ করেছিল এবং প্রায় ৬,০০০ বিহারি ও দালাল পাকিস্তানিদের সহযোগিতা করেছিল ও সহধর্ষক হিসেবে ছিল।

* যৌনদাসী:
যৌনদাসী পদ্ধতিতে নারীকে দীর্ঘদিন বন্দী রেখে ধর্ষণ করা হয়।
পাকিস্তান আর্মিরা তাদের ক্যাম্পগুলোতে এসব নারীদের বন্দী করে রাখতো এবং দিনের পর দিন গণধর্ষণ করতো।
এই বন্দিনী নারীদের কোন পোশাক পরতে দেয়া হতো না, যাতে ওরা পালিয়ে যেতে বা আত্মহত্যা না করতে পারে।
ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি জানাচ্ছে, পাকিস্তানিরা যৌনদাসী পদ্ধতিতে প্রায় ১,৪০,৪০০ জন নারীকে নির্যাতন করেছিল এবং এদের ৮০ ভাগই গর্ভধারণ করে।
বন্দী এসব নারীদের চল্লিশ ভাগ যুদ্ধের সময় খুন হয়, অতিরিক্ত ধর্ষণে মারা যায় ও আত্মহত্যা করে।
পাকিস্তানিরা পরিকল্পিতভাবে বাঙালি নারীদের বন্দী করে ধর্ষণ করতো, যাতে তারা পাকিস্তানিদের সন্তান গর্ভধারণ করেন।
বাঙালি নারীদের ধর্ষণের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানিরা তাদের লালসা চরিতার্থ ও বাঙালি জাতির প্রতি ঘৃণার চুড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ করে।
পাকিস্তানিরা ভাবতো এতে করে বাঙালি জাতিকে তারা জাতিগত ধোলাইয়ের মাধ্যমে বিশুদ্ধ করছে।
একাত্তরে বাঙালি নারীর প্রতি যে সহিংসতা পাকিস্তানিরা করেছে, তা মানব ইতিহাসে নজিরবিহীন।

দ্য রেইপ অব বাংলাদেশ – অব্রে মেনন
২৩ জুলাই, ১৯৭২ / দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় অধিকৃত বাংলাদেশে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী, বিহারী ও দালালদের কর্তৃক সংঘটিত নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার চিত্র ছিল ভয়াবহ।
এর পিছনে জৈবিক অসৎ উদ্দেশ্যের চেয়ে বেশি কাজ করেছিল বাঙালির প্রতি পাকিস্তানিদের তীব্র ঘৃণা ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি।
১৯৭২ সালের সরকারি এক হিসেবে বলা হয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী, বিহারী ও দালালদের দ্বারা নির্যাতিত নারীর সংখ্যা ০২ লক্ষ।
এই হিসেবের ভিত্তি ছিল ঢাকার দূরবর্তী একটি থানা; যেখানে মুক্তিযুদ্ধের সময় সেই থানায় প্রায় ৬০০ জন নারী নিপীড়িত হন অর্থাৎ, মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় তথা, ২৭০ দিনের প্রতিদিন গড়ে ০২ জন নারী নিপীড়িত হয়।
একে ভিত্তি ধরে বলা হয়েছিল, তৎকালীন ৪৮০ টি থানায় মুক্তিযুদ্ধের ২৭০ দিনের প্রতিদিন গড়ে ০২ জন করে মোট ২,৫৯,২০০ জন নারী নিপীড়িত হয়। (৪৮০ টি থানা X ২৭০ দিন X ০২ জন নিপীড়িত নারী = ২,৫৯,২০০ জন নিপীড়িত নারী)। কিন্তু এই পরিসংখ্যানটি কেবলই অনুমান নির্ভর ও অপূর্ণাঙ্গ; কারণ, মাঠ পর্যায়ে করা বিভিন্ন গবেষণায় ও মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় নিপীড়িত নারীর সংখ্যা এরচে অনেক বেশি।
ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির মাঠ পর্যায়ে জরিপ চালিয়ে বলছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্যাতিত নারীর সংখ্যা কমপক্ষে ৪,৬৮,০০০ জন।
সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় চার লাখ নারীকে নির্যাতন করা হয়েছিল।
অস্ট্রেলিয়ান চিকিৎসক ডা. জিওফ্রে ডেভিস ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে এসেছিলেন; উদ্দেশ্য মুক্তিযুদ্ধে নিপীড়িত নারীদের চিকিৎসা সেবা দেওয়া।
ডা. ডেভিস বলছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্যাতনের ফলে গর্ভধারণ করেছেন, এমন নারীর সংখ্যা প্রায় ০২ লক্ষ এবং প্রায় ০৪ লক্ষ ৩০ হাজার নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিংস কমিটি মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধান করে কমপক্ষে প্রায় সাড়ে সাতশ নারীর সন্ধান পেয়েছে, যাদের অপহরণ করে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিংস কমিটি তাদের মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধান থেকে আরো জানাচ্ছে, একাত্তরে সেপ্টেম্বরের পরে তথা মুক্তিযুদ্ধের শেষ তিন মাসে নিপীড়িত হন প্রায় ০১ লক্ষ ৬২ হাজার জন নারী; এদের মধ্যে নির্যাতনের ফলে গর্ভধারণ করেছিলেন প্রায় ৮৮,২০০ জন, এই নিপীড়িতরা দেশ শত্রুমু্ক্ত হবার পর তথা ১৯৭২ সালে গর্ভপাতের জন্য কোন সরকারি বা বেসরকারি ক্লিনিকের সেবা নেন নি।
বাঙালি নারীর বিরুদ্ধে পাকিস্তানিদের এই সহিংসতা ছিল পরিকল্পিত, সংগঠিত, ব্যাপক এবং নৃশংসতম।
ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিংস কমিটির মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধান, ডা. জিওফ্রে ডেভিসের এই বিষয়ে কর্ম অভিজ্ঞতা ও অনুসন্ধান এবং সুইডেনের উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রতিবেদনে মুক্তিযুদ্ধের সময় অধিকৃত বাংলাদেশে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী, বিহারী ও দালালদের দ্বারা সংঘটিত নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার যেসকল সংখ্যাগত পরিসংখ্যান দেয়া হয়েছে, বস্তুতঃ অপরাধ সংঘটনের প্রকৃতি বিচারে এর সংখ্যা আরো অনেক বেশি।
এছাড়া অসংখ্য নিপীড়িতের হদিস পাওয়া যায়নি, অনেক অপরাধ সংঘটনের খবর পাওয়া যায়নি।
‘উপস্থিত ধর্ষণের’ শিকার হয়েছেন, এমন অনেকে সামাজিক ও পারিবারিক অসহিষ্ণুতার কথা চিন্তা করে নিপীড়নের কথা প্রকাশ করেননি; এমন অনেক পরিবার আছে, যাঁদের নারী সদস্যরা নিপীড়িত হবার পর ভারতে চলে গেছেন, আর ফিরেননি; এছাড়া পাকিস্তানে অনেক নারীকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
এই ধরণের ঘটনাগুলোতে আমরা শুধুমাত্র প্রকাশিত হয়েছে, এমন ঘটনাগুলোর কথাই জানি কিন্তু প্রকাশিত হয়নি, নিপীড়িত মুখ খুলেননি, নিপীড়িতের হদিস পাওয়া যায়নি, এমন ঘটনাগুলো আমরা জানি না, হয়তো কখনোই জানতে পারবো না।
তারপরও মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধান ও গবেষণা হতে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় অধিকৃত বাংলাদেশে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী, বিহারি ও দালালরা নারীর বিরুদ্ধে যে পাশবিক সহিংসতা সংঘটন করেছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে তার সম আর কোন নজির নেই।
সামগ্রিক বিষয়াদি বিবেচনায় আনলে, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় অধিকৃত বাংলাদেশে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী, বিহারি ও দালালদের দ্বারা কম করে ০৫ লক্ষ নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। এইরকম ভয়াবহ নৃশংসতার নজির মানব ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া দুঃসাধ্য।

Comments

Popular posts from this blog

মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতনে পাকিস্তানি মানস

কল্পিত বিহারি গণহত্যাঃ একাত্তরের পরাজিত শক্তির অপকৌশল

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে চীনের ভূমিকা ও ভাসানীর দায়